কলকাতা পুরসভায় বড়সড় রদবদল, সম্মান বাঁচাতে মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন ফিরহাদ হাকিম

কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন মোড়। দীর্ঘ প্রায় আট বছর সফলভাবে দায়িত্ব সামলানোর পর কলকাতার মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দিতে চলেছেন ফিরহাদ হাকিম। দলীয় সূত্রে খবর, তিনি নিজেই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। অবশেষে তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে এবং ফিরহাদ হাকিমের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে তাঁর এই পদত্যাগের ইচ্ছায় সম্মতি দিয়েছেন দলীয় নেত্রী। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা পুরসভার প্রথম সংখ্যালঘু মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়া ফিরহাদ হাকিমের এই আকস্মিক প্রস্থান রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
প্রশাসনিক জটিলতা ও পদত্যাগের কারণ
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে কলকাতা পুরসভায় কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল ফিরহাদ হাকিমের পক্ষে। প্রশাসনিক নানা জটিলতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি একাধিকবার বাধার মুখে পড়ছিলেন বলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানান। পুরসভার অন্দরে কাজের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় তিনি সসম্মানে পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তৃণমূলের বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ফিরহাদ হাকিম বারবার দলনেত্রীর কাছে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্মান রক্ষার্থেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সম্মানজনক প্রস্থানের আবেদনে অনুমোদন দিয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই পদত্যাগের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বুধবারই ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যার ফলে দল কার্যত আড়াআড়ি দুই ভাগে বিভক্ত। একই দিনে তৃণমূলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এই চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর তত্ত্বাবধানে হওয়া প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পুরসভার কমিশনার এখন থেকে বিধায়কদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করবেন।
কলকাতা বন্দর কেন্দ্রের বিধায়ক তথা ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফিরহাদ হাকিম ২০১৮ সালে প্রথমবার কলকাতার মেয়র হন এবং ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার এই আসনে বসেন। দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রিত্ব ও মেয়র পদ সমানতালে সামলানোর পর তাঁর এই ইস্তফা কলকাতা পুরসভার দৈনিক প্রশাসনিক কাজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পুর কমিশনারের ওপর বিধায়কদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে কলকাতার পুর-পরিষেবা এবং সার্বিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর ওয়াকিবহাল মহলের।