শত শত কোটির তহবিল হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা, ঋতব্রতর অভ্যুত্থানের পর এবার কি কোষাগার বাঁচাতে পারবে কালীঘাট?

শত শত কোটির তহবিল হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা, ঋতব্রতর অভ্যুত্থানের পর এবার কি কোষাগার বাঁচাতে পারবে কালীঘাট?

বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র এক মাসের মাথায় নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে ঘাসফুল শিবির। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলে বড়সড় অভ্যুত্থানের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে। বিধানসভার স্পিকার বিদ্রোহীদের অংশকেই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে অনুমোদন দেওয়ায় আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা চরম রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি এখন প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শত শত কোটি টাকার দলীয় তহবিল। তৃণমূল (ম) অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি তৃণমূল (ঋ) অর্থাৎ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়— কার দখলে যাবে এই বিপুল সম্পত্তি, তা নিয়েই এখন পর্দার আড়ালে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

বিপুল তহবিলের উৎস ও বর্তমান স্থিতি

নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া বিগত পাঁচ বছরের আর্থিক খতিয়ান অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস দেশের অন্যতম ধনী আঞ্চলিক দল। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ আর্থিক বছর পর্যন্ত দলটির মোট ঘোষিত আয় ছিল প্রায় ১,৬৯১ কোটি টাকা। এর বড় অংশ এসেছে অধুনালুপ্ত ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে, যার পরিমাণ ছিল ১,৫৯২.৫২ কোটি টাকা। বন্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে ‘ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে রেকর্ড ১৮৪.৫ কোটি টাকা অনুদান সংগ্রহ করেছে তারা, যা দেশের যেকোনো আঞ্চলিক দলের চেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ২২৭.৫৯ কোটি টাকা খরচ করার পরেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, দলীয় মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলোতে বর্তমানে অন্তত ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা অক্ষত রয়েছে।

সংকটের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই রাজনৈতিক ভাঙনের মূল কারণ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং ঋতব্রত গোষ্ঠীর আকস্মিক ক্ষমতা দখল। এর সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। যদি এই বিপুল তহবিলের চাবি নব্য বা ঋতব্রত গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে আগামী দিনে দল পরিচালনা করা এবং নতুন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলন গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। দলের সুদিনের বিত্তশালী নেতা-মন্ত্রীদের একাংশ দুর্দিনে পাশে না থাকায় কালীঘাটের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

কালীঘাটের আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি

বর্তমানে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়া থাকায় কোষাধ্যক্ষ পদটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে নব্য গোষ্ঠী যাতে তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে, সেজন্য পাল্টা আইনি ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব। বিদ্রোহীদের গৃহীত সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবং দলের নিজস্ব সংবিধান খতিয়ে দেখে দ্রুত আদালতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে তৃণমূল (ম) শিবির। ফলে প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি এখন এই বিপুল আর্থিক স্বত্ব রক্ষা করাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *