দলীয় রাশ হারানোর শঙ্কায় মমতা, কোন পথে ঘুরবে তৃণমূলের ভাগ্য?

দলীয় রাশ হারানোর শঙ্কায় মমতা, কোন পথে ঘুরবে তৃণমূলের ভাগ্য?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পালাবদল শুরু হয়েছে। যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ছিলেন শেষ কথা, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সেই দলেই তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন খর্ব হওয়ার মুখে। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির এখন দলের অন্দরে অত্যন্ত শক্তিশালী। ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই স্পিকারের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ফলে নিজের তৈরি দলেই এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

স্পিকারের ভূমিকা ও আইনি বিতর্ক

তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষে চিঠি দেওয়ার পর স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে দ্রুত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পিকার বিধানসভার সর্বময় কর্তা হলেও তাঁর পদটি সাংবিধানিক। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখার জন্য আরও কিছুটা সময় নিতে পারতেন।

মহারাষ্ট্রের শিবসেনা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনের ভিত্তিতেই বিধানসভার দলনেতা নির্বাচন করা যায় না, সেখানে মূল রাজনৈতিক দলের অনুমোদনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আগামী দিনে আদালতে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে পারে।

মহারাষ্ট্র মডেলের পুনরাবৃত্তি ও প্রতীক যুদ্ধ

বিদ্রোহী বিধায়করা অন্য কোনও দলে যোগ না দিয়ে নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছেন। এই পরিস্থিতি জাতীয় রাজনীতিতে শিবসেনা বা এনসিপি-র দল ভাঙনের স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। অতীতে উদ্ধব ঠাকরে বা শরদ পাওয়ারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠীকেই প্রকৃত দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং মূল প্রতীক বরাদ্দ করেছিল।

তৃণমূলের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ লড়াই এখন নির্বাচন কমিশন ও আদালতের দিকে মোড় নিতে পারে। দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁক গলে দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিদ্রোহী শিবির যদি নিজেদের মূল দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হয়তো নতুন নাম ও প্রতীক নিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নামতে হবে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিদ্রোহের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাংশের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। বিদ্রোহী শিবির প্রকাশ্যে মমতাকে পরামর্শদাতার ভূমিকায় যাওয়ার আহ্বান জানালেও, কার্যত এর ধাক্কা এসে পড়েছে তাঁরই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর। পশ্চিমবঙ্গের এই নজিরবিহীন ক্ষমতার লড়াই শুধু তৃণমূলের সংকট নয়, বরং দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। দলীয় রাশ ধরে রাখতে না পারলে আঞ্চলিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য যে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, ছাব্বিশের এই রাজনৈতিক অধ্যায় তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *