ক্ষমতার হাতবদল হতেই রণক্ষেত্র সুরুচি সঙ্ঘ, সচিব গ্রেফতার হতেই ভাঙচুর ও লুটপাট!

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম হাইপ্রোফাইল বারোয়ারি দুর্গাপুজো কমিটি ‘নিউ আলিপুর সুরুচি সঙ্ঘ’-এর ক্লাবঘরে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ক্লাবের দাপুটে সচিব স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারির পরদিনই স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ও একদল যুবক ক্লাবের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় প্রভাবশালী এই ক্লাবকর্তার বিরুদ্ধে ‘চোর-চোর’ স্লোগান ওঠার পাশাপাশি প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ভাইয়ের নামে তৈরি হোর্ডিং-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়। ক্লাবঘরের ভেতর থেকে নতুন শাড়ি, বিছানা, মিক্সি ও পানীয় জলের বোতল লুটপাটের বেশ কিছু দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
টালিগঞ্জের এক রূপটানশিল্পীকে শ্লীলতাহানি ও খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হন স্বরূপ বিশ্বাস। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই নেতার পতনের পরেই মূলত জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জনসেবার আড়ালে এই ক্লাবের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অশালীন ও অবৈধ কার্যকলাপ চালানো হতো।
টলিপাড়ায় ক্ষমতার অবসান ও রাজনৈতিক পালাবদল
স্বরূপ বিশ্বাসের এই গ্রেফতারি কেবল একটি অপরাধমূলক মামলার বিষয় নয়, এর পেছনে রয়েছে টলিপাড়া ও রাজ্য রাজনীতির এক বড়সড় পটপরিবর্তন। স্বরূপ বিশ্বাস দীর্ঘ সময় ধরে ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’-র সভাপতি হিসেবে স্টুডিয়োপাড়ায় একছত্র আধিপত্য চালাতেন। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, ভীতি প্রদর্শন ও গা-জোয়ারির ভুরিভুরি অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তা চাপা পড়েছিল। তৃণমূল সাংসদ দেব-সহ চলচ্চিত্র জগতের অনেকেই এখন তাঁর এই দাপটের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল এবং ভোটের ময়দানে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পরাজয়ের পর থেকেই এই শিবিরের ক্ষমতা কমতে শুরু করে। বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর দাবি অনুযায়ী, স্টুডিয়োপাড়ায় স্বরূপের এই ফেডারেশনের অস্তিত্ব কার্যত মুছে যাওয়ার পথে এবং এখন থেকে তা নতুন সমীকরণে নিয়ন্ত্রিত হবে।
পতনের কারণ ও দূরপ্রসারী প্রভাব
মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, টলিপাড়ার কলাকুশলীদের ওপর দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের ওপর তৈরি হওয়া পুঞ্জীভূত ক্ষোভই এই পতনের মূল কারণ। একসময়ে যে সুরুচি সঙ্ঘের মণ্ডপ উদ্বোধন করতেন মুখ্যমন্ত্রী এবং যেখানে রাজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের ভিড় লেগেই থাকত, ক্ষমতার হাতবদল হতেই তা আজ জনরোষের কেন্দ্রবিন্দু।
এই ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। প্রথমত, টলিপাড়ার স্টুডিয়োপাড়ায় দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট রাজ ও ভয়ের পরিবেশের অবসান ঘটতে পারে, যা সাধারণ টেকনিশিয়ানদের কাজের স্বাধীনতা ফেরাবে। দ্বিতীয়ত, উৎসব সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা বছরের পর বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছিল, এই ঘটনা তাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলানোর সাথে সাথে কীভাবে জনসমর্থন ও সমীহ রাতারাতি ক্ষোভ আর প্রতিরোধে রূপ নিতে পারে, সুরুচি সঙ্ঘের এই ভাঙচুর তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।