বিধায়কদের পর এবার সাংসদদের পালা! দল ভাঙার মুখে চরম অস্তিত্ব সংকটে মমতা

বিধায়কদের পর এবার সাংসদদের পালা! দল ভাঙার মুখে চরম অস্তিত্ব সংকটে মমতা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সুনামি এবার লোকসভাতেও আছড়ে পড়তে চলেছে। ৫৮ জন বিধায়কের দলত্যাগের পর এবার দলের ১৮ জন সাংসদও বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। টিভি৯ ভারতবর্ষের এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দল ভাঙার ছক

সূত্রের খবর, বাংলায় বিদ্রোহী বিধায়কদের মতো এবার লোকসভাতেও তৃণমূল সাংসদদের একটি নতুন গোষ্ঠী তৈরি হতে চলেছে, যার নেতৃত্ব দিতে পারেন দলেরই এক প্রবীণ ক্ষুব্ধ সাংসদ। আগামী ৭ জুন কলকাতায় কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সভাপতিত্বে বিদ্রোহী সাংসদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকা হয়েছে। এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ৮ জুন, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি দিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে সংসদীয় দলের নেতা পদ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অপসারণের দাবি জানাতে পারে। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে অন্তত ১৯ জনের সমর্থনের প্রয়োজন, আর এই গোষ্ঠীটি ২২ জন সাংসদকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে রাজ্যসভার ১৩ জন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত থাকায় সেখানে ভাঙনের কোনো সম্ভাবনা নেই।

শুভেন্দুর দিল্লি সফর ও বিজেপির প্রতি নরম মনোভাব

আগামী ৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, সেই একই দিনে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে তৃণমূলের ১৮ জন বিদ্রোহী সাংসদও দিল্লিতে পৌঁছাবেন। জানা গেছে, এই সাংসদরা স্পিকার এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করে কেন্দ্রীয় এজেন্সির পদক্ষেপ থেকে বাঁচতে সংসদীয় সুরক্ষার দাবি জানাতে পারেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে এই বিদ্রোহী সাংসদরা ভবিষ্যতে সংসদের অভ্যন্তরে বিজেপির প্রতি একটি নরম মনোভাবাপন্ন ‘মিত্র বিরোধী দল’ হিসেবে কাজ করতে পারেন।

মমতার মরিয়া চেষ্টা ও দলের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা

দলকে খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া থেকে বাঁচাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উদ্যোগী হয়ে মুর্শিদাবাদ, হাওড়া ও উত্তর দিনাজপুরের বিদ্রোহী বিধায়কদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করছেন। তবে তাঁর এই প্রচেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সম্প্রতি কালীঘাটে তাঁর ডাকা জরুরি বৈঠকে মাত্র ৬ জন সাংসদ (যার মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম) এবং ৮ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। এর পাশাপাশি, মুর্শিদাবাদের ৯ জন মুসলিম বিধায়কের মধ্যে ৮ জনই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরের হাত ধরায় মমতার সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকেও বড় ধস নেমেছে।

তৃণমূল নেতাদের ওপর জনরোষ ও ডিম হামলা

দলের এই শীর্ষ স্তরের ভাঙনের সমান্তরালে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে। ঝাড়গ্রামে তোলাবাজির অভিযোগে তৃণমূল কাউন্সিলর অরিজিৎ দাস ঠাকুরকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যেই ডিম ছোড়ে জনতা, পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। নিউ আলিপুরে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন তৃণমূল নেতা স্বরূপ বিশ্বাস, যার গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। অন্যদিকে, কোচবিহারে কাটমানি ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে জামালদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান গীতা বর্মন এবং মাথাভাঙার নেতা শহিদুল মিয়ার বাড়ি ঘেরাও করে পচা ডিম ও জলের বোতল ছোঁড়ে বিক্ষুব্ধ মহিলারা, যার জেরে প্রাণভয়ে তাঁরা খাটের নিচে লুকিয়ে পড়তে বাধ্য হন। ২৮ বছরের পুরোনো দল তৃণমূল কংগ্রেসের এমন শোচনীয় পরিস্থিতি দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলায় দলটির রাজনৈতিক আয়ু এবার শেষের মুখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *