ব্যবসায় ধস নাকি ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই, কোন পথে হাঁটবেন ইউটিউব কাঁপানো খান স্যর!

বিহারের পটনার কিসান কোল্ড স্টোরেজ এলাকা, যা কি না রাজ্যের অন্যতম বড় কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত, সেখানে আচমকাই যেন মেঘ নেমে এসেছে। গত ২ জুন জনপ্রিয় শিক্ষক ফয়জ়ল খান ওরফে ‘খান স্যর’-এর প্রতিষ্ঠান ‘খান গ্লোবাল স্টাডিজ়’ (কেজিএস) এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রোশন আনন্দের ‘জ্ঞান বিন্দু জিএস অ্যাকাউন্টিং’-এর মধ্যেকার সংঘাত ও হিংসাত্মক ঘটনা দেশের শিক্ষামহলে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ওই দিন খান স্যরের কোচিং সেন্টারে ভাঙচুর এবং তার পরদিন রক্ষীদের গুলি চালনার অভিযোগে পুলিশি পদক্ষেপের পর থেকেই সরগরম পটনার অলিন্দ। আপাতত পটনা জেলা আদালত থেকে খান স্যর আগাম জামিন ও গ্রেফতারি থেকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ পেলেও, তাঁর সাজানো কোচিং সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
তীব্র আইনি জট ও প্রশাসনিক খাঁড়া
আদালত আপাতত খান স্যরকে গ্রেফতারি থেকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মূল আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি তাঁর ব্যবসার পরিধিকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পটনার ডিআইজি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, কোনও কোচিং সেন্টার যদি গ্যাং-কেন্দ্রিক বিরোধের আখড়া হয়ে ওঠে, তবে সেটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, বিহার দমকল বিভাগ কেজিএসের অফলাইন কেন্দ্রগুলিতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ত্রুটি থাকার অভিযোগে পৃথক নোটিস জারি করেছে। ফলে আইনি বিবাদের পাশাপাশি পরিকাঠামোগত কারণেও প্রতিষ্ঠানটির অফলাইন শাখাগুলি প্রশাসনিকভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্যবসায়িক মডেল ও ডিজিটাল মাধ্যমে বড় ধাক্কা
খান স্যরের পুরো ব্র্যান্ডটি তাঁর নিজস্ব পড়ানোর শৈলী, ব্যক্তিত্ব এবং সরাসরি উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। পটনা ও দিল্লিতে কেজিএসের একাধিক কেন্দ্রে তিনি নিজেই ক্লাস নেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া বা জিজ্ঞাসাবাদের কারণে তাঁর অনুপস্থিতি ঘটলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থমকে যাবে। কম খরচে বিপুল সংখ্যক নিম্নবিত্ত পড়ুয়াকে পড়ানোর যে মডেল তিনি তৈরি করেছেন, তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি এই ডামাডোলের জেরে নতুন অনলাইন কোর্স সাবস্ক্রিপশন কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যৎ এডটেক বিনিয়োগের পথও রুদ্ধ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা তাঁর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ইউটিউবে ২ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকা ‘খান জিএস রিসার্চ সেন্টার’ চ্যানেলটি তাঁর আয়ের একটি অন্যতম বড় উৎস। হিংসা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে যদি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ‘কমিউনিটি গাইডলাইন’ লঙ্ঘিত হয়, তবে চ্যানেলটির মনিটাইজ়েশন বন্ধ বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। এর ওপর আবার দিল্লি হাই কোর্টে সাংবাদিক অঞ্জনা ওম কশ্যপের দায়ের করা ২ কোটি টাকার মানহানির মামলাও তাঁকে সামলাতে হচ্ছে। এই বহুমুখী আইনি লড়াই ও বিপুল অর্থ ব্যয় খান স্যরকে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও আশঙ্কার মাঝেই নিজের লক্ষ্যে অবিচল খান স্যর ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে তিনি আবারও সবকিছু নতুন করে গড়ে তুলবেন।