“বিয়ে মানে পরিচারিকা নিয়োগ নয়!” গৃহিণীরা ‘হোমমেকার’ নন, ‘দেশ নির্মাতা’, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

নয়া দিল্লি: “বিয়ে মানে কোনো পরিচারিকা নিয়োগ নয়। আর ঘরের কাজ সামলানো মহিলারা শুধুমাত্র ‘হোমমেকার’ বা গৃহিণী নন, তাঁরা হলেন আসলে ‘দেশের নির্মাতা’।” এক মামলার শুনানিতে সমাজের মানসিকতায় কার্যত সজোরে ধাক্কা দিয়ে এমনই এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা— গৃহিণীরা বছরের পর বছর ধরে যে নিঃস্বার্থ শ্রম, সময় এবং দক্ষতা পরিবারের পেছনে ব্যয় করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম।
২০০১ সালে পাঞ্জাবের এক গৃহবধূর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মামলার শুনানিতে আজ এই নজিরবিহীন রায় দেয় বিচারপতি সঞ্জয় করোলের ডিভিশন বেঞ্চ। মৃত ওই মহিলার পরিবারের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে গিয়েই গৃহস্থালি শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়টি সামনে আনে শীর্ষ আদালত।
প্রথমে মোটর অ্যাকসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনাল এই ঘটনায় মাত্র ২.৪২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছিল। পরে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ৮.৪ লক্ষ টাকা করে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই সমস্ত নির্দেশকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ একধাক্কায় বাড়িয়ে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা করার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে।
আদালত এই রায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইনও বেঁধে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় কোনো গৃহবধূর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওই মহিলার গৃহস্থালি শ্রমের ন্যূনতম মাসিক মূল্য কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা ধরে হিসাব করতে হবে। কারণ একজন গৃহবধূর কাজ শুধু রান্নাবান্না বা ঘর গোছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি একটি পুরো পরিবারকে ধরে রাখেন, সন্তানদের মানুষ করেন এবং সমাজ তথা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন।
বিবাহিত জীবনে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে আদালত আরও জানায়, সংসারের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই। কোনো মহিলা বিবাহিত বলেই নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন বা ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে বাধ্য নন। সন্তান মানুষ করার পাশাপাশি কোনো নারী যদি নিজের কর্মজীবনে এগিয়ে যেতে চান, তবে সেটিকে কোনোভাবেই স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির প্রতি ‘নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে দেখা যাবে না।
আদালতের মতে, সমাজে গৃহিণীদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর ত্যাগ সবসময় অদৃশ্যই থেকে যায়। তাই তাঁদের এই শ্রমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই অবদান পারিবারিক সম্পত্তিতেও নারীর ন্যায্য অধিকারকে আরও শক্তিশালী করে। পাশাপাশি, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার যাতে দ্রুত এই ক্ষতিপূরণ পায়, তার জন্য দেশের সমস্ত হাইকোর্টকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।