সংসদে নজিরবিহীন মহাবিদ্রোহ, শুভেন্দুর মেগা চালে কি এবার খণ্ডবিখণ্ড হতে চলেছে তৃণমূল!

বিধানসভার পর এবার দেশের সংসদ ভবনেও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন মহাবিদ্রোহ। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাশ আলগা করে লোকসভার সিংহভাগ সাংসদ এবার বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) শিবিরে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। দলত্যাগী এই বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তৃণমূলের মোট ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জনই এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে অস্বীকার করে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করতে চলেছেন। সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে আয়োজিত একটি হাইপ্রোফাইল বৈঠকে তৃণমূলের একাধিক হেভিওয়েট সাংসদকে উপস্থিত থাকতেও দেখা গিয়েছে। এই ভাঙনের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়ানোর কৌশল ও বিদ্রোহের নেপথ্য কারণ
আইনি জটিলতা ও দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) এড়াতে লোকসভার মোট সাংসদ সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১৯ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের সঙ্গে ২০ জন সাংসদ রয়েছেন, যা আইনি বাধা পার করার জন্য যথেষ্ট। সূত্রের খবর, এই গোটা বিদ্রোহের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছে গত মে মাস থেকে। গত ১৪ মে কালীঘাটে দলীয় বৈঠকে বারাসাতের প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ডানা ছাঁটা হয়। তাঁকে লোকসভার চিফ হুইপের পদ থেকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হয়। এই সিদ্ধান্তের পরই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন কাকলি। অভিমানী কাকলির এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে তাঁকে রাতারাতি ‘ওয়াই’ (Y) ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বেই দিল্লির স্পিকার ওম বিড়লার দপ্তরে ২০ জন সাংসদের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদাল দাবি করেন, “দলে এখন দুর্নীতি এবং ভুল কাজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে আমাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।” তাঁর এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, তৃণমূল ভাঙার এই মেগা অপারেশনের নেপথ্যে মূল কারিগর শুভেন্দু অধিকারী নিজেই। অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানের তৃণমূল সাংসদ শর্মিলা সরকারও দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, ভোটের পরবর্তী হিংসা নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে রিপোর্ট জমা দিলেও উপরতলা থেকে কোনও পরামর্শ বা নির্দেশ আসেনি। ভোটের হারের পর দল সম্পূর্ণ দিশাহীন হয়ে পড়েছিল এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও পথ খোলা ছিল না। এর পাশাপাশি, রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ অত্যন্ত আকর্ষণীয় হওয়ায় তিনি এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই এনডিএ জোটে সামিল হতে চান। মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান এই বিষয়ে নীরব থাকলেও, জানা যাচ্ছে নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার ও কর্মীদের চাপে পড়েই তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিধানসভার ‘বিদ্রোহ’ এবং তৃণমূলের আগাম আঁচ
লোকসভার এই বিদ্রোহের সমান্তরালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও একই রকম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই বিদ্রোহ ঘোষণা করে তৃণমূল পরিষদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছেন। বিধানসভার এই সফল অভ্যুত্থানই দিল্লির সাংসদদের সাহস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিদ্রোহী শিবিরের এক শীর্ষ সাংসদ গোপন সূত্রে জানিয়েছেন, গত ৮ জুন যখন দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের বৈঠক চলছিল, ঠিক তখনই এই বিদ্রোহ ঘোষণার দিনক্ষণ আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। একই দিনে রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের পদত্যাগের বিষয়টিও এই পরিকল্পনারই অংশ ছিল। অন্যদিকে, দমদমের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায়কে দিল্লির এক বিজেপি নেতা সরাসরি ফোন করলেও তিনি সেই প্রস্তাব বিনম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তৃণমূলের অন্দরের খবর, গত ৩ জুন থেকেই দলের অন্দরে ভাঙনের আঁচ পেয়েছিলেন মমতা ও অভিষেক। সন্দেহভাজন সাংসদদের ধরে রাখতে এবং তাঁদের অবস্থান জানতে লাইভ ছবি পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ধারণা ছিল, বড় জোর ১০ থেকে ১২ জন সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গে যেতে পারেন। কিন্তু সেই সংখ্যাটা যে একধাক্কায় ২০-তে পৌঁছে যাবে, তা কল্পনার বাইরে ছিল নেতৃত্বের। দলের এক বিশ্বস্ত নেতার কথায়, একটা নির্বাচনী ধাক্কাতেই এভাবে ভোল বদলে ফেলা ভাবা যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভা ও বিধানসভায় এই জোড়া ধাক্কায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এখন গভীর সঙ্কটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।