৪ বছরে দু’বার সিজারের সময় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! ডাক্তারের কাণ্ডে তাজ্জব হাইকোর্ট

একই হাসপাতাল, একই চিকিৎসক এবং চার বছরের ব্যবধানে হওয়া দুই নবজাতকের মাথায় অবিকল একই ধরনের আঘাত! কলকাতার এক দম্পতির দুই সন্তানের জন্মকে কেন্দ্র করে এমনই এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনা সামনে এসেছে, যা শেষ পর্যন্ত গড়াল কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। ২০১২ ও ২০১৬ সালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় দুই শিশুর মাথাতেই চিকিৎসকের ছুরির আঘাত লাগে। এই ঘটনায় চিকিৎসকের গাফিলতির অভিযোগ তুলে পরিবার আইনি লড়াই শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিল হাইকোর্ট।
২০১২ থেকে ২০১৬: চার বছরের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি
আদালতের নথি ও মামলা সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১২ সালে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে নিজের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ভর্তি করিয়েছিলেন এক যুবক। সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের (C-Section) মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু দম্পতি লক্ষ্য করেন, সদ্যোজাত শিশুর মাথার এক পাশে কানের ঠিক উপরে একটি গভীর কাটার দাগ রয়েছে।
ঘটনার বিবরণী নিচে তুলে ধরা হলো:
- প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে আশ্বাস: সে সময় হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পরিবারকে জানান, অস্ত্রোপচারের সময় অসাবধানতাবশত সামান্য ছুরির আঘাত লেগে গিয়েছে। সময়ের সাথে ক্ষত ঠিক হয়ে যাবে এবং সেখানে চুল গজাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি এবং মেয়েটির মাথায় একটি স্থায়ী চুলহীন দাগ থেকে যায়।
- দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও একই আঘাত: এর ঠিক চার বছর পর, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ওই যুবক পুনরায় তাঁর স্ত্রীকে একই হাসপাতালে এবং সেই একই চিকিৎসকের অধীনেই ভর্তি করান। ১১ মার্চ সিজারের পর এবার একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই সদ্যোজাত ছেলের মাথাতেও ঠিক একই জায়গায় একই রকম কাটার দাগ দেখতে পান বাবা-মা।
এই অভাবনীয় ঘটনার পর চিকিৎসক নিজেই নাকি ওই পিতাকে বলেছিলেন যে, তাঁর ১২ বছরের পেশাগত জীবনে এটি দ্বিতীয় এমন ঘটনা এবং কাকতালীয়ভাবে প্রথম ঘটনাটি তাঁদেরই কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। একজন বাবা হিসেবে চার বছরের ব্যবধানে দুই সন্তানের একই ক্ষতি দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই ব্যক্তি।
পুলিশি তদন্ত ও আইনি লড়াইয়ের টানাপড়েন
নিজের সন্তানদের এই পরিণতির বিচার চেয়ে আলিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ওই ব্যক্তি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ভবন, পেশেন্টস বেনিফিট ট্রাস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল Councils (West Bengal Medical Council)-এর কাছেও চিকিৎসকের গাফিলতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে শোরগোল শুরু হতেই নিজের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আদালতের দ্বারস্থ হন অভিযুক্ত চিকিৎসক। তাঁর দাবি ছিল, অস্ত্রোপচারের সময় এই আঘাত সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে লেগেছিল এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সময় দুই শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।
হাইকোর্টে শুনানির সময় মূলত দুটি আইনি প্রশ্ন ওঠে:
- সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় নবজাতকদের মাথায় এমন আঘাত লাগা নিছক দুর্ঘটনা, নাকি চিকিৎসায় চরম অবহেলা?
- এই ঘটনাকে কি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৩৮ ধারার অধীনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে?
ফৌজদারি মামলা খারিজ করে কী জানাল হাইকোর্ট?
এই মামলার শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের জমা দেওয়া রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয় যে, এই ঘটনাটি অত্যন্ত বিরল এবং পুরোপুরি ‘কাকতালীয়’। চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের আঘাত করেননি, অস্ত্রোপচারের জটিলতার কারণে ভুলবশত এটি ঘটেছে।
মেডিক্যাল কাউন্সিলের এই রিপোর্টকে মান্যতা দিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, পুলিশ এই তদন্তে চিকিৎসকদের বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতকে অগ্রাহ্য করেছে। রায় দিতে গিয়ে আদালত স্পষ্ট জানায়:
- চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঝুঁকি: চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবসময়ই কিছু না কিছু ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে। চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত বা নিখুঁত ফলাফল মেলেনি বলেই সেটিকে ফৌজদারি অপরাধ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না।
- পরবর্তী চিকিৎসা: দুই ক্ষেত্রেই আঘাত লাগার পরপরই শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসা করা হয়েছিল এবং ক্ষত সারানোর বিষয়ে পরে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার গাফিলতির আর কোনও অভিযোগ আনা হয়নি।
মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্ট এবং আইনি যুক্তিকে ভিত্তি করে অবশেষে বিচারপতি সংশ্লিষ্ট ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত ফৌজদারি মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি খারিজ করার নির্দেশ দেন।