রোগ সারানোর নামে বোনকে ওঝার লালসার শিকার বানাল ভাই, আদালত শোনাল কঠোরতম শাস্তি!

উত্তর প্রদেশের সোনভদ্র জেলায় রোগ সারানো এবং ভূত তাড়ানোর অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় এক ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় দিল আদালত। প্রায় ৯ বছর পুরোনো এক চাঞ্চল্যকর মামলায় ভণ্ড ওঝা এবং এই জঘন্য অপরাধের মূল ষড়যন্ত্রকারী খোদ নির্যাতিতার আপন ভাইকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার সোনভদ্রের রবার্টসগঞ্জ এলাকার ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের (FTC) অতিরিক্ত দায়রা জজ বিপিন কুমার তৃতীয়ের আদালত দুই অপরাধীকে এই কঠোর সাজা শোনায়।
চিকিৎসা ও ভূত তাড়ানোর আড়ালে হাড়হিম করা চক্রান্ত
সরকারি আইনজীবী সত্যপ্রকাশ ত্রিপাঠি আদালতের সামনে এই ঘটনার পুরো নৃশংস খতিয়ান তুলে ধরেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে বারাণসী জেলার চৌবেপুর থানা এলাকার বাসিন্দা এক বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জননী বেশ কিছুদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন। শারীরিক এই অসুস্থতার কারণে তিনি চন্দৌলিতে নিজের বাপের বাড়িতে এসে দিন কাটাচ্ছিলেন।
ঘটনার ভয়ানক বিবরণী নিচে দেওয়া হলো:
- ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া: ২০১৭ সালের ২৬শে এপ্রিল নির্যাতিতার নিজের ভাই লালু শর্মা ওরফে জনার্দন শর্মা বোনকে ভালো করার নাম করে সোনভদ্রের রবার্টসগঞ্জ থানা এলাকার ঝাপরি গ্রামের এক নামী ওঝার কাছে নিয়ে যান। ওই ওঝার নাম জগদেব শর্মা ওরফে জয়দেব শর্মা (৫৫)।
- নির্জন স্থানে কুর্কীতি: রোগ পরীক্ষার পর ওই দিন রাত প্রায় ১১টা নাগাদ ওঝা জগদেব শর্মা দাবি করে যে মহিলার শরীরে অশুভ আত্মার ভর রয়েছে এবং তা তাড়ানোর জন্য একটি বিশেষ তান্ত্রিক ক্রিয়া করতে হবে। এই অজুহাতে মহিলাকে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি অন্ধকার ও নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ওই ওঝা।
- খুনের হুমকি: নির্যাতিতার চিৎকারে তাঁর ভাই ও বোন ঘটনাস্থলে ছুটে এলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁদের সব কথা খুলে বলেন। সেই সময় অপরাধের কথা বাইরে জানাজানি হওয়ার ভয়ে অভিযুক্ত ওঝা ওই পরিবারকে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখার জন্য এবং মুখ খুললে সপরিবারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
দীর্ঘ ৯ বছরের লড়াই এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়
এই পাশবিক অত্যাচারের পর দিন অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২৭শে এপ্রিল রবার্টসগঞ্জ থানায় গিয়ে ওঝা এবং নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে লিখিত এফআইআর দায়ের করেন সাহসী ওই মহিলা। অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে পুলিশ দ্রুত ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারী আধিকারিকেরা ওঝার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ এবং খোদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে নিজের বোনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে চার্জশিট পেশ করেন।
আদালতের দেওয়া সাজার মূল বিষয়গুলি নিচে তুলে ধরা হলো:
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলা ম্যারাথন শুনানির পর আদালত অভিযুক্ত ওঝা জগদেব শর্মাকে ধর্ষণের অপরাধে এবং নির্যাতিতার ভাই লালু শর্মাকে ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে উভয়কেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।
- আর্থিক জরিমানা: আদালত উভয় অপরাধীর প্রত্যেককে ১,৫০০ টাকা করে জরিমানাও ধার্য করেছে। এই জরিমানা সময়মতো পরিশোধ না করলে আসামিদের আরও অতিরিক্ত ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিচারক।