দল ভেঙে চুরমার! এবার কলকাতা ও দিল্লি দুই রণাঙ্গনে কঠিন যুদ্ধের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভাগ্য চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। একদিকে নির্বাচনের ধাক্কা, আর অন্যদিকে দলের অন্দরে নজিরবিহীন বিদ্রোহ ও বিভাজন— এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি। যখন তিনি ভাঙা দল জোড়া লাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই তাঁকে রাজনৈতিক ও আইনিভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত এক সুপরিকল্পিত ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা’ বা ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে।
কলকাতায় ধস, ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক নিয়ে ‘আসল তৃণমূল’ দাবি ঋতব্রতের
তৃণমূল কংগ্রেসের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে এখন এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের তলার মাটি সরানোর মূল দায়িত্বে রয়েছেন বিদায়ী দলেরই হেভিওয়েট বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী।
রাজ্য স্তরের এই বিদ্রোহের প্রধান দিকগুলি হলো:
- বিধায়ক দলে ভাঙন: ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই ৬০ জনেরও বেশি তৃণমূল বিধায়ক দল ছেড়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।
- বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি: বিধানসভার স্পিকার ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরের নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিরোধী দলের নেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা তৃণমূলের বিধায়ক দলকে আইনিভাবে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে।
- প্রতীক ও সম্পত্তির দাবি: ঋতব্রতের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠী নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করতে শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই তারা তৃণমূলের নির্বাচনী প্রতীক এবং দলীয় সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নিজেদের আইনি অধিকার দাবি করে নির্বাচন কমিশনের (EC) Lunarস্থ হতে চলেছে।
বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এটি কেবল শুরু। আগামী দিনে ব্লক স্তর এবং সংগঠনের অন্যান্য নিচু স্তরেও তৃণমূলের মধ্যে আরও বড়সড় ও ব্যাপক ভাঙন দেখা দেবে।
দিল্লিতে ২০ সাংসদের দলবদল, এনসিপিআই-এর শীর্ষ পদে কাকলি ঘোষ দস্তিদার
কলকাতার এই বিধায়ক বিদ্রোহের সমান্তরালে দিল্লিতেও তৃণমূলের সংসদীয় দলে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদ সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক চাল চেলেছেন। তাঁরা দিল্লির দরবারে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)-এর সাথে যুক্ত হয়ে এক পৃথক সংসদীয় গোষ্ঠী গঠন করেছেন।
দিল্লির এই নতুন সমীকরণের খতিয়ান:
গত ২৮শে মে এনসিপিআই-এর তৎকালীন সভাপতি শিউলি কুণ্ডু দলের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং সভাপতির পদ থেকে আচমকা ইস্তফা দেন। এরপরই তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ ২০ জন সাংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দলে যোগ দেন। বর্তমানে বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে এই এনসিপিআই-এর ‘কম্পিউটার ও রাজনৈতিক বিষয়ক কমিটি’-র সর্বসম্মত সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে লোকসভাতেও মমতার কর্তৃত্ব বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল।
দুই রণাঙ্গনে আইনি যুদ্ধ এবং প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার গভীর আশঙ্কা
এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন একই সাথে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ফ্রন্টে অত্যন্ত জটিল আইনি লড়াই লড়তে হচ্ছে:
- প্রথম ফ্রন্ট (কলকাতা): এখানে নির্বাচন কমিশনের সামনে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর নেতৃত্বাধীন অংশটিই প্রকৃত ও আসল তৃণমূল কংগ্রেস, ঋতব্রতের গোষ্ঠী নয়।
- দ্বিতীয় ফ্রন্ট (দিল্লি): লোক선의 স্পিকারের কাছে ইতিমধ্যেই চিঠি দিয়ে দাবি করা হয়েছে যাতে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় ওই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের পদ অবিলম্বে খারিজ বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয় ফ্রন্টের এই আইনি লড়াই অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের দরবারে এই প্রতীক যুদ্ধ চলাকালীন তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে এবং দুই গোষ্ঠীকেই দুটি আলাদা নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে ময়দানে নামতে হতে পারে।
সূত্রের খবর, বিরোধীদের মূল কৌশলই হলো এই আইনি লড়াইকে যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করা। এর ফলে আগামী লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই এই বিদ্রোহী সাংসদদের একাংশের সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিয়ে ভোটে লড়াই করার রাস্তা পরিষ্কার হবে এবং অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ মুসলিম সাংসদদেরও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নতুন পথ বেছে নেওয়ার पर्याप्त সুযোগ মিলবে। সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনের পথ যে অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।