পুলিশের সামনেই ‘ডিম থেরাপি’, জনরোষ নাকি পরিকল্পিত? উঠছে প্রশ্ন

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে এক অভূতপূর্ব ও বিতর্কিত প্রবণতা ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গত কয়েক সপ্তাহে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক প্রথম সারির তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) নেতা ও কর্মীকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে, যাকে রাজনৈতিক পরিভাষায় অনেকেই ব্যঙ্গ করে ‘ডিম থেরাপি’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। এই ঘটনাগুলি শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট নেতাদের রাজনৈতিক অপমানের মুখেই ফেলছে না, বরং এর পেছনে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নাকি কোনও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করছে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কাঠগড়ায় উঠেছে পুলিশের ভূমিকাও।
গত দুই সপ্তাহে ডিম হামলার শিকার এক ডজন নেতা
গত ৩০ মে সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার পর থেকেই এই ধরণের ঘটনার সংখ্যা আকস্মিক ও দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। political মহলের দাবি, গত দুই সপ্তাহে অন্তত এক ডজন তৃণমূল নেতা ও কর্মী এই নজিরবিহীন অপমানের মুখোমুখি হয়েছেন।
সাম্প্রতিক কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- কুণাল ঘোষ (সোমবার সন্ধ্যা): কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় চন্দন নামে এক যুবক বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে লক্ষ্য করে সজোরে ডিম ছোড়ে, যা সরাসরি তাঁর মাথায় লাগে।
- সব্যসাচী দত্ত (৯ জুন): বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র সব্যসাচী দত্তকে গ্রেফতারের পর Genetics বা আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হলে তাঁকে লক্ষ্য করে অন্তত আটবার ডিম নিক্ষেপ করা হয়, যার মধ্যে ৪টি সরাসরি তাঁর গায়ে লাগে।
- বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত (৭ জুন): পাটুলির তৃণমূল কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তকে উত্তেজিত জনতার ডিমের আঘাত থেকে বাঁচাতে পুলিশ কার্যত তাঁকে চ্যাংদোলা করে টেনে গাড়িতে তুলতে বাধ্য হয়।
- জয়প্রকাশ মজুমদার (৫ জুন): পরীক্ষার বা তদন্তের কাজে সল্টলেকে নিয়ে যাওয়া হলে তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বাইরে জনতার ভিড় ও হাতে ডিম দেখে প্রথমে গাড়ি থেকে নামতেই চাননি। পরে নামলে তাঁকেও লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া his।
নীরব দর্শকের ভূমিকায় পুলিশ, উঠছে চরম গাফিলতির অভিযোগ
এই সমস্ত ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নজর কেড়েছে, তা হলো ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের ভূমিকা। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের মাথায় হেলমেট ও হাতে ঢাল বা শিল্ড থাকলেও, তারা হামলাকারীদের আটকানোর ব্যাপারে চরম নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছেন। অনেক সমালোচকের অভিযোগ, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে স্রেফ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস আধিকারিক প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় জমায়েত, ডিমের বিপুল মজুত এবং পরিকল্পিত বিক্ষোভ সম্পর্কে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে আগে থেকে কোনও আগাম তথ্য ছিল না, এটা মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
আইনি এক্তিয়ার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন
অভিযুক্তদের ওপর এই ধরণের প্রকাশ্য হেনস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন মানবাধিকার কর্মী এবং আইনি বিশেষজ্ঞরা।
এই বিষয়ে মূল পর্যবেক্ষণগুলি নিচে দেওয়া হলো:
“কোনও ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেও, আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দেশের আইন অনুযায়ী তাঁকে নির্দোষ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। তাই ধৃত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।”
— সুজাত ভদ্র, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী
ফৌজিদারি আইনজীবীদের মতে, পচা বা সাধারণ ডিম ছুড়ে মারাও আইনের চোখে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধরণের ঘটনার ক্ষেত্রে বেআইনি জমায়েত (Unlawful Assembly), সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা সৃষ্টি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত বা হেনস্থা করার মতো একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা সম্ভব।
জনরোষ বনাম সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা
এই ডিম থেরাপির পেছনে আসল কারণ কী, তা নিয়ে দুই রকম মত তৈরি হয়েছে। পুলিশের একাংশের দাবি, এগুলো কোনও পরিকল্পিত রাজনৈতিক হামলা নয়, বরং বিগত বছরগুলিতে সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা তীব্র ক্ষোভের এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। জোর করে এই ক্ষোভ দমাতে গেলে হিতে বিপরীত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও বড় অবনতি ঘটতে পারত। কলকাতা পুলিশের এক প্রাক্তন কমিশনারের মতে, আগে মানুষ ভয়ে মুখ খুলত না, এখন ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই ভয় কেটে যাওয়ায় ক্ষোভ এভাবে প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসছে। তবে এই তত্ত্ব মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা, তাঁদের মতে পুলিশের উপস্থিতিতে এভাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে ডিম ছুড়ে মারা স্পষ্টতই এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা ও ক্ষমতার আস্ফালন।