ফেসবুকে প্রেম থেকে ১০ বছরের সুখের সংসার, আজ সন্তানদের ছেড়ে বাংলাদেশে নির্বাসনের মুখে কাজল!

বলা হয়ে থাকে ভালোবাসার কোনো কাঁটাতার বা সীমানা নেই, কিন্তু আইনের কঠোর সীমারেখা অনেক সময়ই অত্যন্ত নির্মম হয়ে ওঠে। গুজরাটের আনন্দ জেলা থেকে এমনই এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা সামনে এসেছে, যা একটি সাজানো সুখী পরিবারকে একঝটকায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। একজন মা তাঁর দুটি নিষ্পাপ সন্তানের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চলেছেন, আর স্বামী হারাতে চলেছেন তাঁর স্ত্রীকে। ফেসবুকে শুরু হওয়া এক অদ্ভুত প্রেমের গল্প আজ আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে চরম ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
ফেসবুকের প্রেম থেকে বধূবেশে গুজরাটে আগমন
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। গুজরাটের আনন্দ জেলার লম্ভভেল গ্রামের বাসিন্দা তরুণ প্যাটেলের সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় বাংলাদেশের তরুণী কাজোলি বেবোর।
- বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা: সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ আলাপচারিতা খুব দ্রুত গভীর বন্ধুত্ব এবং পরবর্তীতে ভালোবাসায় পরিণত হয়।
- সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আগমন: দুজনেই একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভালোবাসার টানে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে আসেন কাজোলি।
নাম পরিবর্তন ও ১০ বছরের সুখী সংসার
ভারতে আসার পর কাজোলি হিন্দু ধর্ম ও ভারতীয় সংস্কৃতিকে মনেপ্রাণে আপন করে নেন। তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘কাজল প্যাটেল’। এরপর সনাতন হিন্দু রীতিনীতি মেনে তরুণ প্যাটেলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দেখতে দেখতে কেটে যায় দীর্ঘ ১০টি বছর। এই সুখী দাম্পত্য জীবনে তাঁদের কোল আলো করে আসে দুটি পুত্রসন্তান। অতীতকে পেছনে ফেলে কাজল যখন পুরোদস্তুর একজন ভারতীয় গৃহবধূ হিসেবে সংসার করছিলেন, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে আচমকাই একদিন তাঁর অতীত বর্তমানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে।
পুলিশি অভিযানে ফাটল ধরল সুখের সংসারে
সম্প্রতি গুজরাট জুড়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে একটি বড়সড় অভিযান শুরু করে রাজ্য পুলিশ। সেই তল্লাশি চলাকালীনই কাজলের আসল পরিচয় পুলিশের সামনে চলে আসে। বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্বের কোনো কাগজপত্র দেখাতে না পারায় পুলিশ কাজলকে আটক করে এবং একটি সরকারি নারী আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অর্থাৎ নির্বাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
দুই শিশুর কান্না ও মানবিক সাহায্যের আকুল আবেদন
কাজলের এই আকস্মিক গ্রেফতারি পুরো প্যাটেল পরিবারকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।
- সন্তানদের আকুলতা: মায়ের কোল ছাড়া কিছুই বোঝে না তাঁদের ২ বছরের ছোট ছেলেটি। অন্যদিকে বড় ছেলেও মায়ের এই আকস্মিক অন্তর্ধান সহ্য করতে পারছে না।
- নিরাপত্তার আশঙ্কা ও স্বামীর আর্জি: স্বামী তরুণ প্যাটেল কান্নায় ভেঙে পড়ে সরকারের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, কাজল যেহেতু হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তাই এই অবস্থায় তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে সেখানে তাঁর সামাজিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আইন নিজের পথে চলবে এটা স্বাভাবিক হলেও, দুটি নিষ্পাপ শিশুর চোখের জল এবং একটি পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াই এখন এক বড় মানবিক প্রশ্ন চিহ্নের মুখে। প্রশাসন এখন আইনের অন্ধ কঠোরতাকে প্রাধান্য দেবে, নাকি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবারটিকে রক্ষা করবে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সবাই।