‘পুরুষ লক্ষ্মী’র পর এবার ‘পুরুষ বিধবা’, ৫ বছর ধরে ভাতা তোলার ঘটনায় শোরগোল!

রাজ্যে রেশন, নিয়োগসহ বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির অভিযোগের আবহে এবার এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল নদিয়া জেলা। ‘পুরুষ লক্ষ্মী’ বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সামনে এল এক ‘পুরুষ বিধবা’র সন্ধান, যিনি বিগত পাঁচ বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকারি বিধবা ভাতা ভোগ করে আসছেন। নদিয়া জেলার সরাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের চরসরাটি এলাকায় এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে, এই দুর্নীতির খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম যেভাবে জনপ্রতিনিধির রোষের মুখে পড়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
চরসরাটি এলাকার বাসিন্দা নরেন ঘোষ নামের এক ব্যক্তি গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি মাসে নিয়ম করে সরকারি বিধবা ভাতা তুলছেন বলে তথ্য মিলেছে। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সরাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বৈদ্যনাথ দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারি ভাতার এই গরমিল ও দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই তিনি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং কর্তব্যরত সাংবাদিককে ‘দালাল’ বলে কটূক্তি করার পাশাপাশি তীব্র অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ। তবে এই প্রশাসনিক গাফিলতির দায় এড়াতে উপপ্রধান অদ্ভুত এক যুক্তি খাড়া করেছেন। তাঁর দাবি, এই প্রক্রিয়ায় পঞ্চায়েতের কোনও স্তরে ভুল হয়নি, যা ভুল হয়েছে তা ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকের (বিডিও) কার্যালয় থেকে হয়েছে। আবেদনপত্র স্ক্রুটিনি বা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি আধিকারিকদের উদাসীনতাকেই তিনি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা ও পরিবারের দাবি
এদিকে এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। গ্রামবাসীদের স্পষ্ট অভিযোগ, যখন ভাতার আবেদনপত্র জমা নেওয়া হয়েছিল, তখনই স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য ও প্রশাসনের বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। তাঁদের দাবি, চোখের সামনে এমন একটি দৃশ্যত ভুল থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অঞ্চল নেতৃত্ব, প্রধান ও উপপ্রধান পুরো বিষয়টি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে নরেন ঘোষের পরিবার। নরেনবাবুর স্ত্রী সুমতি ঘোষ জানিয়েছেন যে, তাঁরা কখনও বিধবা ভাতার জন্য আবেদনই জানাননি। মূলত বার্ধক্য ভাতার জন্যই নির্দিষ্ট ফর্মে আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু প্রশাসনিক বা যান্ত্রিক কোনও ত্রুটির কারণে তা বিধবা ভাতা হিসেবে অনুমোদিত হয়ে যায় এবং অ্যাকাউন্টে টাকা আসতে শুরু করে।
তদন্তের দাবি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই অভিনব সরকারি ও আর্থিক অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। এই প্রসঙ্গে তীব্র সমালোচনা করে বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার জানান, বর্তমান সরকারের আমলে প্রতিটি স্তরে ও প্রকল্পেই পরিকাঠামোগত দুর্নীতি গ্রাস করেছে। পূর্ববর্তী ভুলের সংশোধন ও দ্রুত আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এখন প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মানবিক বা প্রশাসনিক ভুলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে সেই ভুল আড়াল করার উদ্দেশ্যে সংবাদমাধ্যমের ওপর চড়াও হওয়া এবং সাংবাদিকদের অশালীন ভাষায় আক্রমণ করা কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। উপপ্রধানের এই আগ্রাসী মনোভাবই জনসাধারণের মনে দুর্নীতির সন্দেহকে আরও দৃঢ় করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে এই ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল।