উদ্ধবের হাইপ্রোফাইল বৈঠকে অনুপস্থিত ৬ সাংসদ, শিবসেনায় কি তবে চূড়ান্ত ভাঙনের ঘণ্টা বেজে গেল!

মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা টানাপড়েন ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়ে এক বড়সড় নাটকের অবয়ব তৈরি হলো। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার (UBT) অন্দরে ফাটল এখন আর কোনো গুঞ্জন নয়, বরং বাস্তবতার দোরগোড়ায়। দিল্লিতে ডাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দলের মোট ৯ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ৬ জনই অনুপস্থিত থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চরম ধাক্কা দিলেন। দলত্যাগ বিরোধী আইনের কঠিন ফাঁস এড়াতে এবং সাংসদ পদ টিকিয়ে রাখতে যেখানে ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন, ঠিক সেই সংখ্যার সাংসদই এখন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ায় উদ্ধবের হাত থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
দিল্লির এই বিশেষ বৈঠকটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল লোকসভায় উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে ঠিক কতজন জনপ্রতিনিধি শেষ পর্যন্ত টিকে রয়েছেন, তা যাচাই করা। কিন্তু বাস্তবে ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। বিদ্রোহী রুখতে বুধবারই শিবসেনা (UBT)-র লোকসভার দলনেতা অরবিন্দ সাওয়ান্ত কড়া হুইপ জারি করে সকাল ১১টার বৈঠকে সমস্ত সাংসদকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি প্রয়াত বাল ঠাকরের প্রসঙ্গ টেনে অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া সত্ত্বেও শেষরক্ষা হলো না। ৬ সাংসদ গরহাজির থাকায় দলের পক্ষ থেকে শোকজ নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেও, রাজনৈতিক মহলের মতে এই পদক্ষেপ এখন গুরুত্বহীন।
আদর্শ বিচ্যুতি বনাম কোটি টাকার লেনদেনের বিস্ফোরক অভিযোগ
ইতিমধ্যেই এই ৬ বিদ্রোহী সাংসদ—সঞ্জয় যাদব, ভাউসাহেব ওয়াকচৌরে, সঞ্জয় দেশমুখ, নাগেশ পাতিল আশ্তিকড়, সঞ্জয় পাতিল এবং ওমরাজ নিম্বালকর লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চার পাতার চিঠি দিয়ে পৃথক গ্রুপ তৈরির কথা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের ছেলে শ্রীকান্ত শিন্ডে ও মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী প্রতাপ সারনায়েকের উপস্থিতিতে স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া ওই চিঠিতে সাংসদরা স্পষ্ট লিখেছেন, উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বের ওপর তাঁদের কোনো আস্থা নেই এবং বর্তমান দল প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
এই চরম সংকটের মাঝেই আসরে নেমে সঞ্জয় রাউত এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন। স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্রোহী সাংসদদের প্রত্যেককে দল ছাড়ার জন্য ৫০ কোটি টাকা করে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ কোটি টাকা অগ্রিম বা অ্যাডভান্স হিসেবে দেওয়া হয়েছে। রাউত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, যাদের যাওয়ার তারা পদত্যাগ করে নতুন করে জনগণের মুখোমুখি হোক। অন্য দিকে, শিন্ডে শিবিরের মুখপাত্র শীতল মাত্রে পালটা আক্রমণ শানিয়ে বলেন যে, সাংসদদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার পরিবর্তে তাঁদের গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় রাজনীতি ও বিরোধী জোটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
মহারাষ্ট্রের শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, শিবসেনা (UBT) ভাঙার পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। তবে ২০২২ সালে মূল শিবসেনা এবং ২০২৩ সালে এনসিপি (NCP) ভাঙার পর, গত ৪ বছরের মধ্যে মহারাষ্ট্রে এটি তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক বিপর্যয়। কাকতালীয়ভাবে, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই পশ্চিমবঙ্গের ২০ জন তৃণমূল সাংসদ দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে এনডিএ জোটের শরিক একটি ছোট দলের সঙ্গে সংযুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। ঠিক তার পরেই মহারাষ্ট্রে উদ্ধবের এই দুর্গে ভাঙন জাতীয় স্তরে বিরোধী শিবিরের সামগ্রিক শক্তিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। লোকসভায় এই বৃহৎ ভাঙন বিরোধী জোটকে জাতীয় রাজনীতির আঙিনায় অনেকটাই ব্যাকফুটে ঠেলে দেবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।