‘আপনার আশীর্বাদে ওসি হলাম’, সোনা পাপ্পু কাণ্ডে ধৃত জয়ের মোবাইল চ্যাটে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁশ

‘আপনার আশীর্বাদে ওসি হলাম’, সোনা পাপ্পু কাণ্ডে ধৃত জয়ের মোবাইল চ্যাটে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁশ

কলকাতার কুখ্যাত জমি সিন্ডিকেট ও সোনা পাপ্পু কাণ্ডে ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদারের প্রভাবের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল, তা নিয়ে এক বিস্ফোরক দাবি করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। নগর দায়রা আদালতে জমা দেওয়া ৭৭ পাতার চার্জশিটে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটিয়ে জয় প্রায় ৪৭.৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশের অন্দরে পদোন্নতি, বদলি এবং মামলার গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার মতো এক সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন এই ব্যবসায়ী।

পুলিশের বদলি ও পদোন্নতির নেপথ্যে জয়ের কলকাঠি

ইডির চার্জশিট অনুযায়ী, পুলিশের একাংশের কাছে জয়ের ভাবমূর্তি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের বেশ কিছু আধিকারিক তাঁকে ‘লর্ড’, ‘মাই লর্ড’ বা ‘বস’ বলে সম্বোধন করতেন। ধৃত ব্যবসায়ীর মোবাইল চ্যাট খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, এক পুলিশ আধিকারিক থানার দায়িত্ব (ওসি) পাওয়ার পর জয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে মেসেজ করেছিলেন, “আপনার ভালবাসা, আশীর্বাদ এবং স্নেহে আজ ওসি হিসাবে যোগ দিলাম।” তদন্তে প্রকাশ, ২০২২ সালে ইনস্পেক্টর পদে উন্নীত হলেও ওই আধিকারিক দীর্ঘদিন থানার দায়িত্ব পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে এক সহকর্মীর মাধ্যমে জয়ের শরণাপন্ন হতেই তাঁর ভাগ্যবদল হয়। এমনকি জয়ের বাড়ির কালীপুজোতেও ওই আধিকারিকসহ একাধিক পদস্থ পুলিশকর্তা, আমলা ও রাজনীতিকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সৌজন্য হিসেবে জয় তাঁদের রুপোর বার উপহার দিতেন বলেও চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের মুখ বন্ধ করতে পুলিশেরই ব্যবহার

জয়ের এই বিপুল প্রভাবের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীরা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও কোনো বিচার পাননি বলে ইডির কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন দুই ব্যবসায়ী। বজবজের এক ফ্লাই অ্যাশ ইট কারখানার মালিক ইডিকে জানিয়েছেন, জয়ের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র সরোবর থানায় অভিযোগ জানালেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ করেনি। উল্টে জয় ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করেন। এমনকি কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি; উল্টে কালীঘাট থানায় ডেকে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার চাপ দেওয়া হয়। বেহালার অপর এক ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। জয়ের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করার পর তদন্ত তো হয়েইনি, উল্টে এন্টালি থানায় ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা রুজু করা হয়।

ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

তদন্তকারীদের মতে, সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দারের জমিদখল সিন্ডিকেটের সঙ্গে জয়ের গভীর যোগসূত্র ছিল। ভয় দেখিয়ে কম দামে জমি ও সম্পত্তি হস্তগত করার এই চক্রটি নির্বিঘ্নে চালাতে জয় প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই প্রভাবশালী চক্রের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের গ্রেফতারি প্রমাণ করে যে, অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের শিকড় কতদূর গভীরে পৌঁছেছিল। যদিও জয় কামদার সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কেবল ‘পরিচিতি’ বা ‘চা খাওয়ার’ সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছেন। তবে তাঁর ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের নম্বর ও অভ্যন্তরীণ নথি এই চক্রের গভীরতা এবং আগামী দিনে পুলিশ প্রশাসনের অন্দরে আরও বড়সড় রদবদল বা আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *