কলকাতায় মুছে গেল সোরাবর্দির নাম, হিন্দুরক্ষক গোপাল পাঁঠার স্মরণে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের!

কলকাতার বুকে দীর্ঘদিনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। পার্ক সার্কাসের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ‘সোরাবর্দি অ্যাভিনিউ’-এর নাম পরিবর্তন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এবার থেকে এই রাস্তাটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘গোপাল মুখার্জী রোড’। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের পবিত্র ক্ষণে কলকাতা পুরসভার নেওয়া এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে রবিবার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের প্রয়াস
পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থিত এই ব্যস্ততম রাস্তাটি কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ১৯৩২ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (কেআইটি) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য তথা বিশিষ্ট চিকিৎসক স্যার হাসান সোরাবর্দির নামে এই রাস্তাটির নামকরণ করেছিল। তবে অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোরাবর্দির নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ১৯৪৬ সালের ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর এক রক্তাক্ত ও বিতর্কিত অধ্যায়। মহম্মদ আলি জিন্নার ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও হিন্দু গণহত্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার নেপথ্যে হোসেন শহিদ সোরাবর্দির প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হলো সেই যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলে প্রকৃত রক্ষককে সম্মান জানানো। দাঙ্গার সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে পাকপন্থী দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে কলকাতার হিন্দু বাঙালিকে রক্ষা করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন বউবাজারের বাসিন্দা গোপাল মুখোপাধ্যায়। পেশায় কসাই হওয়ার কারণে যিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই সে সময় কলকাতায় পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মতে, এই নাম বদলের সিদ্ধান্ত এক ঐতিহাসিক ভুল শোধরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব
শনিবার পশ্চিমবঙ্গ দিবসে তারকেশ্বরের এক সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯৪৬ সালের সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে এনে পূর্বতন সরকারগুলির সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি মদতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান এবং এই ইতিহাস বঙ্গবাসীর কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তব্যের দিনই কলকাতা পুরসভা এই নাম বদলের সিদ্ধান্ত নেয়, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সিদ্ধান্তের ফলে কলকাতার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক বড় ধরনের প্রভাব পড়তে চলেছে। একদিকে যেমন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ সহ শাসক দল ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘ন্যায়সঙ্গত’ বলে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে এই নাম বদলকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক ও মেরুকরণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে কলকাতার প্রকৃত ইতিহাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।