চিনে কি সত্যি বর্ণপ্রথা চলছে? বিতর্কের কেন্দ্রে ড্রাগনভূমির ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা!

একুশ শতকের কমিউনিস্টশাসিত চিনে কি বর্ণপ্রথা বা জাতিভেদ প্রথা চালু রয়েছে? সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ভারতীয় নেটাগরিকদের একাংশের এমন দাবিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেজিং এতটাই অস্বস্তিতে পড়েছে যে, চিনা সরকারি মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই দাবিকে চিনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত বলে আখ্যা দিয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চিনের বহু চর্চিত ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও দীর্ঘদিনের সমালোচনা রয়েছে।
কী এই ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা ও তার প্রভাব
বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) এবং মাও জে দংয়ের নেতৃত্বে এই ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা চালু হয়। এটি মূলত একটি অভ্যন্তরীণ পাসপোর্ট ও বংশানুক্রমিক জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নাগরিকদের গ্রাম এবং শহরের বাসিন্দা হিসেবে আলাদা করা হয়। এই ব্যবস্থার কারণেই চিনের গ্রামীণ এলাকার মানুষ স্বাধীনভাবে শহরে এসে পাকাপাকিভাবে বসবাস করা বা সম্পত্তি কেনার অধিকার পান না। শহরের জমির ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমানো এবং শিল্পপতিদের সস্তায় শ্রমিক সরবরাহ করার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থাটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে চিন। এর ফলে দেশে মারাত্মক আর্থসামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ হুকোউরা নামমাত্র মজুরিতে বিপজ্জনক কাজ করতে বাধ্য হন এবং শহরে শ্রম দিলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার পেতে তাঁদের বাধ্য হয়ে গ্রামেই ফিরে যেতে হয়।
বর্ণপ্রথা নাকি নিছকই প্রশাসনিক নিয়ম
প্রাচীন চিনে কনফুসিয়াসের মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে পেশাগত চারটি সামাজিক শ্রেণি (শি, নং, গং, শাং) থাকলেও তা বংশানুক্রমিক ছিল না। কিন্তু আধুনিক হুকোউ একটি কঠোর বংশানুক্রমিক প্রথা হওয়ায় অনেক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক একে রাষ্ট্রের তৈরি নগরভিত্তিক বর্ণপ্রথা বলে মনে করেন। অন্যদিকে চিনা শিক্ষাবিদদের দাবি, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এর সঙ্গে জাতিভেদের কোনো সম্পর্ক নেই। উল্টে গ্লোবাল টাইমসের মতো চিনা গণমাধ্যম ভারতের জাতিভেদ প্রথাকে নিশানা করে পালটা আক্রমণ শানিয়েছে। তবে হুকোউ প্রথাকে ঘিরে ওঠা এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বিতর্ক যে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বেজিংয়ের অস্বস্তি ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে, তা স্পষ্ট।