দলনেত্রীর ডাকা ভোট লুটের অভিযোগে সায় নেই তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীদের, আইনি লড়াইয়ে অনীহা ২০৩ জনের

দলনেত্রীর ডাকা ভোট লুটের অভিযোগে সায় নেই তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীদের, আইনি লড়াইয়ে অনীহা ২০৩ জনের

দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র অসন্তোষ এবং আইনি লড়াইয়ের বার্তা সত্ত্বেও বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকে কার্যত মেনে নিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ পরাজিত প্রার্থী। ভোট প্রক্রিয়ায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে সরব হয়ে একশোটিরও বেশি আসনে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছিলেন স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী। তবে আদালতে মামলা করার নির্দিষ্ট ৪৫ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর কলকাতা হাই কোর্টের পরিসংখ্যানে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ধরা পড়েছে। পাহাড়ের বাইরে ২৯১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া ২১১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র আটজন প্রার্থী আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, যার মধ্যে একটি মামলা খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাকি ২০৩ জন পরাজিত প্রার্থীই আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটেননি, যা শাসক দলের অন্দরের এক প্রচ্ছন্ন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, ফল ঘোষণার ৪৫ দিনের মধ্যে কেবল সংশ্লিষ্ট পরাজিত প্রার্থীই ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে ‘ইলেকশন পিটিশন’ দায়ের করতে পারেন। দলনেত্রীর কড়া সুরের পর মনে করা হয়েছিল যে ঘাসফুল শিবিরের একটি বড় অংশ আইনি পদক্ষেপ করবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, বিপুল আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতা ধরে রাখলেও তৃণমূলের অন্দরে আইনি লড়াইয়ের সেই তৎপরতা দেখা যায়নি। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ছ’টি কেন্দ্রের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে। সব মিলিয়ে হাই কোর্টে দুই দলের পক্ষ থেকে মাত্র ১৪টি ইলেকশন পিটিশন দায়ের হয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলের একাংশকে বিস্মিত করেছে।

বাস্তব প্রমাণের অভাব ও দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি

তৃণমূলের অন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবই প্রার্থীদের পিছু হটার প্রধান কারণ। দলেরই এক বিধায়কের মতে, রাজনৈতিক মঞ্চে কারচুপির অভিযোগ তোলা যতটা সহজ, আদালতে তা প্রমাণ করা ততটাই কঠিন। ইলেকশন পিটিশন টিকিয়ে রাখার জন্য যে অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তা অধিকাংশ প্রার্থীর কাছে ছিল না। উপরন্তু, বহু প্রার্থী মনে করছেন যে এই ধরণের দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত দলকে পাশে পাওয়া যাবে না। নদীয়া জেলার এক পরাজিত প্রার্থীর ক্ষোভ, দলনেত্রী ১০০ আসনে ভোট লুটের কথা বললেও সুনির্দিষ্টভাবে আসনগুলির তালিকা বা প্রার্থীদের একজোট করে মামলা লড়ার কোনো কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে কেউ বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করে আইনি জটিলতায় জড়াতে চাননি।

দূরত্ব বৃদ্ধি ও সাংগঠনিক স্তরে ক্ষোভের প্রকাশ

এই আইনি নিষ্ক্রিয়তার পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও নেতৃত্বের সঙ্গে প্রার্থীদের একাংশের দূরত্ব বৃদ্ধির বিষয়টিও স্পষ্ট হচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৩০টি আসনে তৃণমূল প্রার্থীরা ১০ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। এমনকি সাতগাছিয়ায় ৪০১ ভোট বা জাঙ্গিপাড়ায় ৮৬২ ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও প্রার্থীরা মামলা করতে রাজি হননি। জাঙ্গিপাড়ার প্রার্থী তথা প্রাক্তন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী তো সরাসরি রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিতদের নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে চিঠি পাঠাতে বললেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা তা এড়িয়ে গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দলের এই বিশাল অংশের উদাসীনতা আসলে সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভাব এবং ফলাফলের পর তৈরি হওয়া এক ধরণের রাজনৈতিক আত্মসমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।

আদালতে মামলার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

যাঁরা মামলা করেছেন, তাঁদের মধ্যে পাণ্ডবেশ্বরের নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, রাজারহাট-নিউটাউনের তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং খোদ ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে পরাজিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটে পরাজিত হয়ে মমতা কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় একতরফা গণনার অভিযোগ এনেছেন। যদিও নির্বাচন কমিশন সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে এই অভিযোগ আগেই খারিজ করেছে। আইনজ্ঞদের মতে, এই ধরণের নির্বাচনী মামলার নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম এবং তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ২০২১ সালের নির্বাচনের আটটি মামলার বেশিরভাগই এখনও ridicu বিচারাধীন। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি লড়াইয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই ২০৩ জন প্রার্থী আদালতের বারান্দায় না গিয়ে জনগণের রায়কে নীরবে মেনে নেওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *