“মানুষের অস্তিত্ব মুছে উন্নয়ন নয়”, জয়গাঁও স্থলবন্দর মামলায় কেন্দ্র ও রাজ্যকে রিপোর্ট জমার নির্দেশ হাই কোর্টের

আলিপুরদুয়ার: একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারি পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিশাল পরিকল্পনা, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী ৮১টি আদিবাসী পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর আতঙ্ক। উন্নয়ন ও জীবিকার এই চরম টানাপোড়েনের মাঝে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারকদের স্পষ্ট বক্তব্য—আইনের কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার বাইরেও এক্ষেত্রে একটি বড় মানবিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।
বিতর্কের নেপথ্যে: ভারত-ভুটান বাণিজ্য আরও গতিশীল করতে আলিপুরদুয়ারের তোর্সা চা-বাগান সংলগ্ন এলাকায় প্রস্তাবিত ‘জয়গাঁও স্থলবন্দর’ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর তৈরির কাজও অনেকটাই গড়িয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে স্থানীয় ৮১টি আদিবাসী পরিবারকে কেন্দ্র করে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে উচ্ছেদ হতে হবে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ১৯৪০ সাল অর্থাৎ প্রায় ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা এই এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডসহ যাবতীয় সরকারি নথি থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ উচ্ছেদের আশঙ্কায় তাঁদের জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকিতে।
আদালতে উভয় পক্ষের অবস্থান: চা-বাগান শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে। মামলাকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৪, ২১ এবং ৩০০এ উল্লেখ করে বলেন, “উন্নয়ন নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু তা মানুষের অস্তিত্ব মুছে ফেলে হতে পারে না।” উপযুক্ত পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে উচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের আইনজীবী জানান, জমিটি সম্পূর্ণ সরকারি খাস জমি এবং বসবাসকারীদের কোনো আইনি স্বত্ব বা মালিকানা নেই। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থেই নিয়ম মেনে পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
হাইকোর্টের বড় নির্দেশ: সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে—উচ্ছেদের মুখে পড়া এই পরিবারগুলির পুনর্বাসনে মানবিক দিক বিবেচনা করে কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তা জানিয়ে আদালতে নির্দিষ্ট রিপোর্ট জমা দিতে হবে। পাশাপাশি মামলাকারীদেরও বিস্তারিত হলফনামা জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।