“খাবার নেই, কান্নাই অপরাধ!” অনাহারে শিশুর আকূতি কাড়ল প্রাণ, মায়ের বিচারে স্তম্ভিত আদালত

বয়স মাত্র দুই বছর। কোনো জটিল চাওয়া ছিল না, দাবি ছিল শুধু একটুখানি খাবারের। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের সংসারে সেই খাবারটুকুই যেন ছিল অলীক বিলাসিতা। খিদের জ্বালায় অঝোরে কেঁদে চলেছিল অবুঝ শিশুকন্যাটি। অনাহার আর চরম অভাবের মানসিক চাপে দিশেহারা মা শেষমেশ সহ্য করতে পারেননি সন্তানের সেই কান্নাকাটি। ক্ষোভের মাথায় দু’বছরের কন্যাসন্তানকে বেধড়ক মারধর করেন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।
সুরতের ভারাছা এলাকার এই হাড়হিম করা ঘটনায় অভিযুক্ত মা লখিবেন সোলাঙ্কিকে সম্প্রতি জামিন দিয়েছে গুজরাত হাইকোর্ট। তবে জামিন মঞ্জুর করার পাশাপাশি আদালত যে পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার মতো।
অভাবের নির্মম বলি শিশু ঈশা
পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্ত লখিবেন তিন সন্তানের জননী। পরিবারটির উপার্জনের কোনো স্থায়ী পথ ছিল না, নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠত। ঘটনার দিন খাবারের জন্য দু’বছরের ঈশা জেদ করে কাঁদতে শুরু করলে, চরম হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে মা নিজের সন্তানের ওপর চড়াও হন।
শিশুটিকে অচেতন হয়ে পড়তে দেখে ভয় পেয়ে যান লখিবেন নিজেই। প্রতিবেশীদের ডেকে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শরীরে আঘাতের চিহ্ন মেলায় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।
‘ব্যর্থ গোটা সমাজ!’— পর্যবেক্ষণ আদালতের
হাইকোর্টের বিচারপতি হসমুখ ডি. সুথার জামিনের শুনানিতে জানান, তদন্তের নথিতে স্পষ্ট যে মা নিজে সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যার প্রমাণ এখানে নেই। বরং দীর্ঘদিনের ক্ষুধা ও চরম অসহায়তাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ।
“ক্ষুধা যখন একজন মাকে নিজের সন্তানের ওপর হাত তুলতে বাধ্য করে, তখন সমাজ বা রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। এটি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতা।” — বিচারপতি হসমুখ ডি. সুথার, গুজরাত হাইকোর্ট
সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থের প্রসঙ্গ
রায় দানকালে আদালত কেবল আইনের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। গুজরাতি সাহিত্যিক পান্নালাল প্যাটেলের উপন্যাস ‘মানভিনি ভাবাই’, ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত ‘লে মিজারেবল’ এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, বাইবেল ও কুরআন থেকে উদ্ধৃতি টেনে বিচারপতি বোঝান— ক্ষুধা কীভাবে মানুষের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নেয়।
আদালত স্পষ্ট করেছে, জামিন পাওয়ার অর্থ অপরাধ থেকে মুক্তি নয়, বিচার আইন অনুযায়ীই চলবে। তবে স্বাধীনতার এত বছর পরও যখন খাবারের অভাবে একটি অবুঝ শিশুকে প্রাণ হারাতে হয়, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়— এই মর্মান্তিক ব্যর্থতার দায় আসলে কার?