৯০০ মন্দিরের রহস্যময় পাহাড়: সূর্য ডুবলেই কেন জনমানবহীন হয়ে যায় শত্রুঞ্জয়?

কিছু স্থান শুধু ঘুরে দেখার জন্য নয়, আত্মোপলব্ধি ও অনুভূতির এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। গুজরাটের পালিতানা শহরের কাছে অবস্থিত শত্রুঞ্জয় পাহাড় ঠিক তেমনই এক অলৌকিক ও পবিত্র স্থান। প্রায় ৯০০টি শ্বেতমর্মর পাথরের মন্দিরে ঘেরা এই পাহাড়টি বিশ্বজুড়ে জৈন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র। তবে শুধু এর অনন্য স্থাপত্য বা দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য নয়, এই পাহাড়ের একটি সুপ্রাচীন ও কঠোর নিয়ম একে পুরো বিশ্ব থেকে আলাদা করেছে—সূর্যাস্তের পর এখানে কোনো মানুষের অবস্থান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসতেই পাহাড় ছাড়তে শুরু করেন সমস্ত পুণ্যার্থী, পর্যটক এবং মন্দিরের সেবায়েতরা। গভীর রাত নামতেই পুরো পাহাড়টি এক নিস্তব্ধ দেবনগরীতে পরিণত হয়।
শতাব্দীর সাধনায় গড়ে ওঠা দেবনগরী
শত্রুঞ্জয় পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠেছে ৯০০টিরও বেশি শ্বেতমর্মরের মন্দির, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মন্দির কমপ্লেক্স। প্রায় ৯০০ বছর ধরে বহু প্রজন্মের ভক্তদের অক্লান্ত ত্যাগ, শ্রদ্ধা ও স্থাপত্যকলার ফসল এই মন্দিরগুলো। যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বস্ততার এই ধারা আজও জ্বলজ্বল করছে।
৩,৫০০ সিঁড়ি পেরিয়ে আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে হলে পুণ্যার্থীদের পার হতে হয় প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৩,৮০০টি পাথরের সিঁড়ি। এটি কেবল কোনো শারীরিক কষ্ট নয়, বরং ভক্তদের ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও অধ্যাবসায়ের এক চরম পরীক্ষা। শর্টকাটের এই আধুনিক যুগে এই পথ চড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের যেকোনো মহান অর্জন কেবল তপস্যা ও কষ্টের মাধ্যমেই সম্ভব।
সূর্যাস্তের পর কেন নিষিদ্ধ মানুষের আনাগোনা?
বিকেল গড়ালেই পাহাড় খালি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাতে এখানে কোনো মানুষ থাকতে পারেন না। তবে এর পেছনে কোনো নিরাপত্তার কারণ নেই, রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও দর্শন:
- দেবতাদের আরাধনার স্থান: জৈন দর্শন বিশ্বাস করে, রাতের বেলা এই পবিত্র পাহাড়টি দেবদূত ও অদৃশ্য আত্মাদের আরাধনার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়।
- পরম অহিংসা পালন: জৈন ধর্মে ‘অহিংসা’ পরম ধর্ম। রাতের অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে যেন কোনো ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ মানুষের পায়ে পিষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই অদ্ভুত ও পবিত্র সিদ্ধান্ত।
ভেতরের ‘শত্রু’ জয়ের আহ্বান
‘শত্রুঞ্জয়’ শব্দের অর্থ—‘যে স্থান শত্রুকে জয় করে’। তবে এই শত্রু কোনো বাইরের ব্যক্তি বা শক্তি নয়; মানুষের মনের ভেতরের অহংকার, রাগ, লোভ ও মোহই হলো আসল শত্রু। এই দীর্ঘ পাহাড় চড়াই এবং সূর্যাস্তের পর স্থান ত্যাগের নিয়ম মানুষকে নিজের ভেতরের এই কুপ্রবৃত্তিগুলো জয় করার শিক্ষাই দেয়।
সূর্য ডোবার পর যখন শত্রুঞ্জয় পাহাড়ের বুকে এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তখন এক অপরূপ আধ্যাত্মিক শান্তি বিরাজ করে সেখানে। ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ নগরজীবনের মাঝে এই পাহাড় আমাদের শেখায়—পৃথিবীর কিছু স্থান জয় বা দখলের জন্য নয়, কেবল ভক্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতা দিয়ে অনুভব করার জন্য।