‘নল আছে জল নাই’ কালচার শেষ! জঙ্গলমহলে ধর্মান্তর ও জমি কেনাবেচায় কঠোর বিধিনিষেধের পথ খুলছে রাজ্য

বাঁকুড়া: জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে একগুচ্ছ মেগা পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার বাঁকুড়ায় ‘পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ’-এর পর্যালোচনা বৈঠক শেষে তিনি জানান, বিগত সরকারের অবহেলার অধ্যায় পেছনে ফেলে চলতি অর্থবর্ষের আগামী ৮ মাসে এই অঞ্চলের জন্য ১,৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১,৬০০ কোটি টাকাই সরাসরি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে খরচ হবে।
ধর্মান্তর ও জমি কেনাবেচায় কড়া আইনি ব্যবস্থা
বৈঠকে জঙ্গলমহল অঞ্চলে বিদেশি অর্থ সাহায্যে বেআইনি ধর্মান্তর ও মৌলবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে জানান:
- খুব শীঘ্রই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) চালু করা হবে—যার মূল মন্ত্র হবে ‘এক দেশ, এক আইন, এক মুখ্যমন্ত্রী’।
- জঙ্গলমহলে জোরপূর্বক ধর্মান্তর রুখতে আনা হবে কঠোর আইন।
- জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নতুন আইনি বিধিনিষেধ জারি করতে চলেছে রাজ্য সরকার।
“২০১৯ সালের পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকার এই দফতরকে অকেজো করে রেখেছিল। গত অর্থবর্ষে মাত্র ২০ কোটি বরাদ্দ ছিল, কাজ হয়েছিল ৬ কোটি টাকার। কিন্তু আমাদের সরকার এই অঞ্চলের সার্বিক বিকাশে অঙ্গীকারবদ্ধ।” — শুভেন্দু অধিকারী
কাজের সময়সীমা ও মাঠপর্যায়ের নির্দেশ
উন্নয়নমূলক কাজ তরান্বিত করতে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে:
- সেপ্টেম্বর: প্রকল্প চিহ্নিতকরণ ও ডিপিআর (DPR) তৈরি।
- অক্টোবর: টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
- উৎসবের পর: শুষ্ক মরসুম শুরু হতেই সরাসরি মাঠে নেমে কাজ শুরু।
প্রতিটি পিছিয়ে পড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় অন্তত ৫০ লক্ষ টাকার কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝাড়গ্রামে পর্ষদের নতুন কার্যালয় এবং সিউড়িতে ক্যাম্প অফিস চালুর পাশাপাশি জঙ্গলমহলের স্কুলগুলিতে পানীয় জল, ফ্যান, পৃথক শৌচাগার ও কিচেন শেড তৈরির নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। জেলাশাসকদের পারফরম্যান্সে সন্তোষ প্রকাশ করলেও, কাজের ধীরগতি কাটাতে বিডিও-দের আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬টি প্রধান ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প
রাজ্যের প্রতিটি প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে নিম্নলিখিত প্রকল্পগুলি পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
- অন্নপূর্ণা যোজনা
- আয়ুষ্মান ভারত: (যেখানে প্রযোজ্য নয়, সেখানে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমা যোজনা’)
- বিকশিত ভারত যোজনা: ১২,০০০ কোটি টাকার বাজেটে ১২৫ দিনের কাজ ও পরিবার পিছু বছরে ৩৪,৫০০ টাকার সংস্থান।
- প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনা: ২৫ লক্ষ কাঁচা বাড়ির নাম নথিভুক্তির পর পরবর্তী তালিকা তৈরি।
- প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর: রাজ্যে ৫ লক্ষ পরিবারকে সোলার সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য।
- জল জীবন মিশন: প্রশাসনিক গাফিলতি ও চুরি বন্ধ করে প্রতিটি ঘরে পানীয় জল পৌঁছানো।
মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ ও অন্যান্য বার্তা
সরকারি নিয়োগ প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী নিশ্চিত করেন যে, পিএসসি ও এসএসসি-র মতো সংস্থায় যোগ্য ব্যক্তিদের বসিয়ে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। সিপিএমের ‘ক্যাডার রাজ’ ও তৃণমূলের ‘চাকরি বিক্রি’র সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সরকার কেবল শূন্যপদ তৈরি ও বাজেটের অনুমোদন দেবে—বাকি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে অটোনোমাস বোর্ড পরিচালনা করবে।
এ ছাড়া, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীরা সিএএ (CAA)-তে আবেদন করলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাঁদের রেশন বা ভাতা বন্ধ করা যাবে না বলেও তিনি নির্দেশ দেন। সীমান্ত এলাকায় জমি জট মেটানো, ভুয়া ওবিসি তালিকা বাতিল করা এবং ইমাম-মোয়াজ্জেম ভাতা বন্ধের বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।