ধ্বংসস্তূপে প্রাণের আকুতি: কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১৮০ ছাড়াল, নিখোঁজ শতাধিক

কলম্বিয়া: গত সোমবার আঘাত হানা শক্তিশালী ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এখন পর্যন্ত ১৮০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারে রাতদিন এক করে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মী ও হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল থেকে শত শত মাইল দূরেও প্রবল কম্পন অনুভূত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কালি এবং পেরেইরা শহরে। মঙ্গলবারও একাধিক পরাঘাত (আফটারশক) অনুভূত হওয়ায় পুরো এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারীভাবে নিহতের সংখ্যা ১৮১ বলে জানানো হলেও, স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে এই সংখ্যা ২৪০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আহত হয়েছেন প্রায় ২,৬০০ জন এবং এখনও প্রায় ২০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, ভূমিকম্পের আঘাতে ১,১০০টিরও বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৮,০০০টিরও বেশি ভবন।
ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও আতঙ্কের রাত ভূমিকম্পের পর থেকেই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। কারও বাড়ি ধসে গেছে, আবার কেউ ভবনে ফাটল ধরায় আর ভেতরে ফেরার সাহস পাননি।
২২ লাখ মানুষের শহর কালিতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৯৫ জন। সেখানে উদ্ধার তৎপরতা দ্রুত করার জন্য একটি বিশেষ ‘যৌথ কমান্ড পোস্ট’ চালু করা হয়েছে। শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানান, বহু ভবনের পাশাপাশি একটি হাসপাতালের ওপরের তলা ধসে পড়েছে, যার একাংশে শিশুরা চিকিৎসাধীন ছিল। এছাড়া ক্যালিমা এলাকায় একটি স্কুলের ভবন ধসে ৪ শিশু মারা গেছে এবং ৩০ জন আহত হয়েছে। বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট ঠেকাতে কালিতে রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে পেরেইরা শহরে মৃত্যু হয়েছে ৭৯ জনের। সেখানে উদ্ধারকাজে সুবিধার জন্য সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ফুটেজে দেখা গেছে, শত শত উদ্ধারকারী ও সাধারণ মানুষ খালি হাতে এবং কোদাল দিয়ে ইট-পাথর সরিয়ে অলৌকিকভাবে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। শহরের প্রধান চত্বরসহ একাধিক স্থানে ধসে পড়া কাঠামোর নিচে এখনও যানবাহন ও মানুষ আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরাঘাত ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের পর থেকে দেশে ৭০টিরও বেশি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। বহু শহরের মেয়রদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ধরনের যাচাই না করা গুজব বা ভুয়া তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তি আতঙ্ক না তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সংহতি কলম্বিয়ার এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর সমবেদনা জানিয়ে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়াকে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড) জরুরি অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এছাড়া ব্রাজিল, ইকুয়েডর, এল সালভাদর এবং ভেনেজুয়েলার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও ত্রাণ ও সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।