লালকেল্লায় ইতিহাস! স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে পতাকাত্তোলনের আগেই গুঞ্জরিত হবে ‘বন্দে মাতরম’

লালকেল্লায় ইতিহাস! স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে পতাকাত্তোলনের আগেই গুঞ্জরিত হবে ‘বন্দে মাতরম’

নয়াদিল্লি: ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে চলেছে সমগ্র দেশ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপনে লালকেল্লার মূল অনুষ্ঠানে বড়সড় রদবদল আনছে কেন্দ্র। এবার জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পূর্বেই আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশিত হবে ‘বন্দে মাতরম’। সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন দেশের প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং।

বদলাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ এতদিন পর্যন্ত লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীকে ‘গার্ড অফ অনার’ দেওয়া, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ২১ বার তোপধ্বনি এবং জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ গাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দিতেন। তবে ২০২৬ সালের ১৫ আগস্টে এই প্রথায় বড় বদল আসছে। এবার পতাকা উত্তোলনের ঠিক আগেই ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হবে। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ ‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সংগীত এবং ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় গানের মর্যাদা দেয়। এতদিন সরকারি অনুষ্ঠানে এর নির্দিষ্ট প্রোটোকল না থাকলেও, এবার বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার সার্ধশতবর্ষে সেই অপূর্ণতা পূরণ করছে কেন্দ্র।

যুবসমাজ ও মানব-আকৃতিতে বিশেষ শ্রদ্ধা এবারের আয়োজনের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্মকে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য সামনে রেখে NCC ও ‘মাই ইন্ডিয়া’ প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্বাচিত প্রায় ২,৫০০ জন যুবক-যুবতী উপস্থিত থাকবেন লালকেল্লায়। ইউনিফর্ম পরা এই তরুণরা দেবনাগরী হরফে ‘বন্দে মাতরম’ শব্দের এক সুবিশাল মানব-আকৃতি (Human Formation) গড়ে তুলবেন।

এছাড়া, সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার (MI-17) আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করার পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর’ লেখা বিশেষ ব্যানার বহন করে উড়ে যাবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে, সরকারি সমস্ত আমন্ত্রণপত্রে ‘বন্দে মাতরম’-এর মূল ৬টি স্তবকই ছাপা হয়েছে, যাতে আমন্ত্রিত অতিথিরা সম্পূর্ণ রচনাটির সাথে পরিচিত হতে পারেন।

প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও ভিআইপি প্রথায় বদল ভিআইপি কালচারের পরিবর্তে পরিবেশ সচেতনতাকে প্রাধান্য দিতে এবার লালকেল্লার আসন ব্লকগুলির নামকরণে আনা হয়েছে অভিনবত্ব। দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত হ্রদের নামে এই ব্লকগুলির নামকরণ করা হয়েছে।

বিশেষ অতিথি ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে প্রায় ৫,০০০ বিশেষ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহাকাশ গবেষণা, এআই (AI), গ্রিন হাইড্রোজেন ও দেশীয় উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রের নবীন উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি উপস্থিত থাকবেন আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং গ্রাম প্রধানরা। ২৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে আসা ১,৫০০-র বেশি নাগরিক নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশগ্রহণ করে ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি তুলে ধরবেন।

১৮৭৬ থেকে ২০২৬: ‘বন্দে মাতরম’-এর দেড়শো বছরের পথচলা ১৮৭৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই গানটি রচনা করেন এবং ১৮৮২ সালে তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এটি আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এটি প্রকাশ্যে গায়। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে এই গান ছিল দেশপ্রেমের প্রধান মন্ত্র। ব্রিটিশ সরকার গানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও এর জনপ্রিয়তা থামানো যায়নি।

১৫ আগস্ট ২০২৬-এ লালকেল্লার এই বিশেষ আয়োজন কেবল একটি রচনার সার্ধশতবর্ষ উদযাপন নয়, বরং ভারতের জাতীয় ঐতিহ্যে এক অবিস্মরণীয় সংযোজন হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *