‘নাবালিকা মাতৃত্বে বাংলা শীর্ষে থাকাটা লজ্জার!’ প্রসূতিমৃত্যু রুখতে সরকারের কড়া ‘দ্বিমুখী’ চাল

সারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রসূতিমৃত্যু (মাতৃমৃত্যু) এবং নাবালিকা মাতৃত্বের (Teenage Pregnancy) হার চিন্তাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাজ্য সরকার। সোমবার রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট জানান, দেশে নাবালিকা গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষে থাকা অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয়। ১২, ১৩ বা ১৪ বছর বয়সে মেয়েদের মা হওয়া রুখতে সরকার এখন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জেলাওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে ১২ বছর বয়সে মা হওয়া কিংবা ১৪ নম্বর সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকার দুই ধরনের সচেতনতামূলক প্রচার বা ‘দ্বিমুখী কর্মসূচি’ গ্রহণ করেছে: ১. কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। ২. ‘দুটির বেশি সন্তান নয়’ নীতি প্রচার করা।
জেলাজুড়ে বিশেষ নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা: বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রসূতিমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের সুতি-১, সুতি-২ এবং সামশেরগঞ্জ ব্লককে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেলাশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন, নাবালিকা বিবাহের খবর পেলেই প্রশাসনিকভাবে বাধা দিতে হবে। আর বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর মতে, “যাঁরা নাবালিকাকে বিয়ে করছেন, তাঁরা বড় অপরাধী।”
এলাকাভিত্তিক প্রচারের নতুন কৌশল: জনসচেতনতা বাড়াতে এলাকা ভেদে কৌশল বদল করা হচ্ছে:
- পশ্চিম মেদিনীপুরের জনজাতি এলাকায়: ওলচিকি ভাষায় অভিজ্ঞ ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঠানো হবে এবং মায়েদের জন্য আয়োজন করা হবে ‘মাদার্স পিকনিক’।
- মুর্শিদাবাদ ও মালদহের সংখ্যালঘু এলাকায়: সেই সম্প্রদায়ের চিকিৎসকদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হবে।
- গ্রামপর্যায়ে প্রচারের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি, দুই সন্তান হওয়ার পর বিনামূল্যে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ পরিষেবা নেওয়ার জন্যও সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিতর্ক ও অন্যান্য মতামত: সরকারের এই বার্তার প্রেক্ষিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে:
- পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়ন: ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদক ইসমত আরা খাতুন বলেন, একাধিক সন্তান হওয়া বা বাল্যবিবাহ কেবল কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের (যেমন মুসলিম) সমস্যা নয়। এটি আর্থিক অনগ্রসরতা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের ফল। কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে চিহ্নিত না করে সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নত করার দাবি জানান তিনি।
- বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য: ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর শাশ্বত ঘোষ (NFHS-5 সমীক্ষার ভিত্তিতে) জানান, এই সামাজিক সমস্যার দায় কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো ঠিক নয়। মাতৃমৃত্যু রুখতে সময়মতো চিকিৎসা, সঠিক গর্ভকালীন পরিচর্যা ও প্রশাসনিক নজরদারি সবচেয়ে বেশি জরুরি।