ভূমিকম্প নয়! হিমবাহ ধসেই তছনছ নেপাল, মৃত বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ শতাধিক ভারতীয়

নেপালে আচমকা নেমে আসা ভয়াবহ হড়পা বানের পেছনে কোনো ভূমিকম্প ছিল না, বরং হিমবাহ ও পাহাড়ের বিশাল ধসই এই তাণ্ডবলীলার মূল কারণ। আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা (USGS) তাদের আগের ব্যাখ্যা সংশোধন করে এই তথ্য স্পষ্ট করেছে।
প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল নেপাল-চীন সীমান্তে অনুভূত ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু উপগ্রহ চিত্র (Planet Labs) এবং ভূ-কম্পন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে USGS নিশ্চিত করেছে যে, কোনো সাধারণ টেকটোনিক ভূমিকম্প হয়নি। মূলত পাহাড়ের বিশাল অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও কাদা ধসে ‘লেহেন্দে’ নদীতে পড়ে। এরপর সেই কাদা-জলর প্রবল স্রোত তিব্বত সীমান্ত পেরিয়ে নেপালের ‘ভোটেকোশি’ নদীতে উপচে পড়ে এক প্রলয়ঙ্করি ‘ডেব্রিস ফ্লো’ বা কাদামাটির হড়পা বান তৈরি করে। বরফ ও পাহাড়ের এই ভয়াবহ ধসের ফলে যে প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য সেসমিক এনার্জি বা ভূ-কম্পন সংকেত হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের চিত্র: এই প্রলয়ঙ্করি বানে সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে নেপালের রাসুয়া, ধাদিং এবং নুয়াকোট জেলায়। তিব্বত থেকে ধেয়ে আসা কাদা-জলর স্রোত নিমেষের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ব্রিজ, বাড়িঘর, যানবাহন এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
- মৃত ও নিখোঁজ: বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জন মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
- নিখোঁজ বিদেশী পর্যটক: নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৩৪১ জন বিদেশী পর্যটক রয়েছেন, যার মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন।
- তিব্বতেও প্রভাব: চীনের গ্যিরোং (Gyirong) এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে ৩ জনের মৃত্যু এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে।
উদ্ধারকাজ ও বিপর্যস্ত জনজীবন: বর্তমানে দুর্গত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেছে। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষ ব্যাকুল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছে এবং কাদার নিচে চাপা পড়া মৃতদেহ ও জীবিতদের তল্লাশিতে জোরকদমে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে হিমালয় অঞ্চলের নাজুক প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপেক্ষা করে অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে।