পহেলগাঁও হামলা ও জিরো টলারেন্স: নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ব্রিকসের ঐতিহাসিক বার্তা

নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন ও জোটের দুই দশক পূর্তির বিশেষ পর্বে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলো ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনের মূল বার্তা ছিল— “সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই ক্ষমতা গড়ে তোলা”। বহুপাক্ষিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনৈতিক সংহতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার রূপরেখা তৈরিতে এই সম্মেলন এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হলো।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ও পহেলগাঁও হামলা সম্মেলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্রিকস দেশগুলির আপসহীন অবস্থান। ২০২২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সংঘটিত নির্মম সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সর্বসম্মত ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট বলা হয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কড়া জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং একে কোনো ধর্ম, জাতি বা সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে যেকোনো ধরনের ‘দ্বৈত নীতি’ পরিহার করে রাষ্ট্রসংঘের ‘কমপ্রিহেনসিভ কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল টেররিজম’ (CCIT) দ্রুত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আন্তর্জাতিক কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করতে রাষ্ট্রসংঘ ও তার নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) আমূল পরিবর্তনের জোর দাবি উঠেছে এই মঞ্চ থেকে। নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য চিন ও রাশিয়া যৌথভাবে বিশ্বমঞ্চে ভারত ও ব্রাজিলের বড় ভূমিকা পালনের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে ভারতের ডিজিটাল প্রভাব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের নেতৃত্বের ছাপ পুরো সম্মেলনজুড়ে স্পষ্ট ছিল। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধি এবং ব্রিকস পেমেন্ট টাস্কফোর্সের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। গুজরাটের GIFT City-তে ‘BRICS Risk Lab’ ও ‘ICBIC’ প্রতিষ্ঠা এবং বেঙ্গালুরুর ‘নিমহ্যান্স’ (NIMHANS)-কে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ের জন্য প্রধান ব্রিকস ট্রেনিং হাব ঘোষণা করার মতো ভারতের একাধিক প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া ভারতের উদ্ভাবনী ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত প্রযুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’র মাধ্যমে ব্রিকস জোট ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করল, যা বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করল।