ধর্ষণ থেকে রক্ত পাচার: পাঁশকুড়া হাসপাতালে দুর্নীতির ছায়া, খপ্পরে তিন টেকনিশিয়ান

ধর্ষণ থেকে রক্ত পাচার: পাঁশকুড়া হাসপাতালে দুর্নীতির ছায়া, খপ্পরে তিন টেকনিশিয়ান

পাঁশকুড়া: পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। হাসপাতালে সেক্স র‍্যাকেট চালানো, চিকিৎসক নিগ্রহ, ওয়ার্ড গার্লদের লাগাতার নির্যাতন এবং ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত পাচারের মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠছিল দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি পুলিশ ও রাজ্য পুলিশের অ্যান্টি-করাপশন ব্রাঞ্চ (ACB)-এর তদন্তের পর হাসপাতালের তিন ল্যাব টেকনিশিয়ান গ্রেপ্তার হতেই ভয় কাটিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রভাবশালী জাহির বাহিনীর তাণ্ডব ও ‘সেক্স র‍্যাকেট’: স্থানীয় সূত্রের খবর, ২০১৫ সালে হাসপাতাল চালুর পর থেকেই সিকিউরিটি এজেন্সির ফেসিলিটি ম্যানেজার ও অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবসায়ী জাহির আব্বাস খানের প্রভাব বাড়তে থাকে। শাসকদলের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে নিজস্ব বাহিনী তৈরি করেছিল জাহির। ২০২২ সালে গাড়ি পার্কিং কেন্দ্র করে বচসার জেরে হাসপাতালের এক চিকিৎসককে বেদম মারধর করে জাহির বাহিনী। সেই অপমানে ওই চিকিৎসক শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।

এখানেই শেষ নয়, হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট ঘরে ‘সেক্স র‍্যাকেট’ চালানোর পাশাপাশি একাধিক ওয়ার্ড গার্লকে ভয় দেখিয়ে নিয়মিত ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে জাহিরের বিরুদ্ধে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার হয় সে।

রক্ত পাচার ও স্বাস্থ্য দপ্তরের কড়া পদক্ষেপ: দুর্নীতির জাল আরও গভীরে ছড়ায় যখন ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে বেআইনিভাবে রক্ত পাচারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার তদন্তে নেমে রাজ্য পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা সম্প্রতি সুব্রত দাস, মান্তু দাস এবং নজরুল ইসলাম নামে তিন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টকে গ্রেপ্তার করে। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর ইতিমধ্যেই ওই তিনজনকে বরখাস্ত করেছে এবং তাঁরা বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। পাশাপাশি, বিনা চিকিৎসায় এক প্রৌঢ়ের মৃত্যুর ঘটনাতেও হাসপাতালের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও রাজনৈতিক তরজা: চল্লিশ বছর ধরে রক্তদান শিবিরের আয়োজক অসীম দাস গভীর মর্মাহত হয়ে জানান, “সরকারি হাসপাতাল থেকে রক্ত পাচার হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাজ্য সরকারের উচিত অবিলম্বে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।” পারলঙ্কা গ্রামের বাসিন্দা সুপ্রকাশ বাসুলির অভিযোগ, “হাসপাতালের সুপার কৌশিককুমার ঢল বারবার ‘কিছু জানতেন না’ বলে দায় এড়াতে পারেন না। স্বাস্থ্য দপ্তরের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে তমলুকের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (CMOH) বিভাস রায় জানান, “আমাদের নজরদারিতে খামতি নেই। তবে হাসপাতালের আশপাশে কোনো চক্র সক্রিয় থাকার দরুন এসব ঘটেছে, যার ওপর প্রশাসন কড়া নজর রাখছে।”

ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক সিন্টু সেনাপতি দাবি করেন, “তৃণমূলের আমলে এই হাসপাতালটি দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *