আমেরিকা-ইরান সংঘাত: আকাশছোঁয়া এলএনজি দর, এশিয়ায় জ্বালানি বিল দ্বিগুণ!

আমেরিকা-ইরান সংঘাত: আকাশছোঁয়া এলএনজি দর, এশিয়ায় জ্বালানি বিল দ্বিগুণ!

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি বিল এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

স্পট মার্কেটের ধাক্কায় বিপাকে উন্নয়নশীল দেশ ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, চীন ছাড়া এশিয়ার প্রধান পাঁচ উদীয়মান বাজার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বদলে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং কাতার থেকে চালান ব্যাহত হওয়া এই সংকটের অন্যতম কারণ। বিগত এক বছরে এই পাঁচ দেশ স্পট এলএনজি কিনতে মোট ৭.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। অথচ আগের বছর দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির (Long-term Contract) মাধ্যমে সমপরিমাণ গ্যাস ক্রয়ে খরচ হয়েছিল মাত্র ৩.১ বিলিয়ন ডলার। হঠাৎ এই বিপুল ব্যয়বৃদ্ধির ফলে এসব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বিকল্প জ্বালানির খোঁজে মরিয়া এশিয়া আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে এশিয়ার দেশগুলো এখন সোলার, উইন্ড এনার্জি, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে:

  • বাংলাদেশ ও পাকিস্তান: কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ বিকল্প ব্যবস্থায় ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে এবং বর্তমানে রুফটপ সোলার প্যানেলে বিশেষ জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান বাড়িয়ে দিচ্ছে সোলার ও জলবিদ্যুতের ব্যবহার।
  • থাইল্যান্ড ও ভারত: ২০৫০ সালের মধ্যে নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের অন্তত ৬৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে তৈরির পরিকল্পনা করেছে থাইল্যান্ড।
  • কয়লার পুনরুত্থান: এলএনজির দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দিকে ফিরছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) পূর্বাভাস, চড়া গ্যাসের দামের জেরে চলতি বছর বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার রেকর্ড সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে।

স্থগিত ৫২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প, বদলাচ্ছে ক্রয়ের কৌশল ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এশীয় এলএনজি ক্রেতারা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একমুখী নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহকারীদের বৈচিত্র্যময় করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ম্যাককিনসির একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ ক্রেতা ভবিষ্যতে তাঁদের ক্রয়ের কৌশল পরিবর্তন করতে চলেছেন।

গ্যাসের এই অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত মূল্যের কারণে গত পাঁচ বছরে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৭টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হয় স্থগিত, না হয় পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতি পুরোপুরি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *