১৫ বছর পর চিরবিদায়! স্ক্র্যাপইয়ার্ডে যাচ্ছে দেশের প্রথম এসি ডাবল ডেকার

১৫ বছর পর চিরবিদায়! স্ক্র্যাপইয়ার্ডে যাচ্ছে দেশের প্রথম এসি ডাবল ডেকার

অবশেষে সব আশা ও কোটি কোটি টাকার খরচে ইতি টেনে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেল ভারতের প্রথম এসি ডাবল ডেকার সুপারফাস্ট ট্রেন। বহু চেষ্টা ও দফায় দফায় সংস্কারের পরও হাওড়া-ধানবাদ রুটের এই ঐতিহাসিক ট্রেনটিকে রেললাইনে ফেরানো সম্ভব হয়নি। পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, হাওড়া রেল সদনের সামনে পড়ে থাকা এই ঝাঁ-চকচকে ট্রেনটির ঠাঁই এখন স্ক্র্যাপইয়ার্ডেই হতে চলেছে।

পূর্ব রেলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শিবরাম মাজি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “ট্রেনটি বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এটিকে পুনরায় ট্র্যাকে ফেরানোর আর কোনো পরিকল্পনা রেলের নেই।”

শুরু থেকেই বিতর্কের জালে: ট্রায়াল রানেই বিপত্তি দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ উদ্যোগে চালু হয়েছিল এই ট্রেনটি। কিন্তু ২০১০ সালের ২৫ ডিসেম্বর যখন ১১০ কিমি/ঘণ্টা গতিতে এর প্রথম ট্রায়াল রান হয়, তখনই এক বড়সড় কারিগরি ক্রুটি ধরা পড়ে। ট্রেনের বিশেষ নকশার কারণে মশাগ্রাম, শক্তিগড়, বর্ধমান ও দুর্গাপুরের মতো বেশ কিছু স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের সীমানায় ট্রেনের অন্তত ৫টি কামরা সজোরে ঘষা খেতে থাকে। এতে বহু প্ল্যাটফর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে হাওড়া থেকে বর্ধমানের প্রায় ২০টি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত কেটে ছোট করা হয় এবং ওভারহেড বিদ্যুতের তার উঁচুতে তুলে ১ অক্টোবর থেকে পুনরায় ট্রেনটি চালু করা হয়েছিল।

মূল সমস্যা: ভুল নকশা ও প্ল্যাটফর্মে ধাক্কা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ট্রেনের আসল গলদ ছিল এর নকশাতেই। দোতলা আসন ব্যবস্থার কারণে ট্রেনের চাকার মাঝের অংশটি বেশ নিচু রাখতে হয়েছিল। ফলে উচ্চগতিতে চলন্ত অবস্থায় কামরা দুললেই নিচের অংশ প্ল্যাটফর্মের দেয়ালে সজোরে ধাক্কা মারত। বাধ্য হয়ে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালাতে হতো, যা এক সুপারফাস্ট ট্রেনের মূল উদ্দেশ্যকেই নষ্ট করে দেয়।

যাত্রী সংকট ও হাজার কোটির লোকসান যান্ত্রিক গোলযোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিক থেকেও ট্রেনটি ছিল চরম ব্যর্থ।

  • ফাঁকা কামরা: প্রতিটি কামরায় ১২০টি আসন থাকলেও যাত্রী পাওয়া যেত মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
  • বিকল্প ট্রেনের দাপট: এই ট্রেনের ঠিক কাছাকাছি সময়েই চলত শতাব্দী এক্সপ্রেস ও ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো জনপ্রিয় ট্রেন, ফলে যাত্রীরা ডাবল ডেকার এড়িয়ে চলতেন।
  • সিএজি (CAG) রিপোর্ট: ক্যাগ রিপোর্টেও সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে, বিপুল টাকা খরচে এই ট্রেন তৈরি করেও তা সচল রাখতে না পারায় ভারতীয় রেলের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

২০১৬ সালে ছটপূজোর সময়েও শেষবারের মতো ট্রেনটি চালানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সেদিন যাত্রী হয়েছিল মাত্র ২৮ জন। এরপর থেকেই চিরতরে বন্ধ থাকে এর চাকা। দীর্ঘ ১৫ বছরের টানাপোড়েন শেষে ভারতের প্রথম এসি ডাবল ডেকার ট্রেনের ঠিকানা এখন কেবলই স্ক্র্যাপইয়ার্ড।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *