ক্যান্সার ছড়ায় জীবাণু থেকে? ভারতে ১.৯০ লাখ আক্রান্তের নেপথ্যে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া!
/indian-express-bangla/media/media_files/2026/07/12/cancer-7906re3-2026-07-12-15-32-23.jpeg?w=1200&fit=1200,675&ssl=1)
সাধারণ ধারণায় ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। মূলত জিনগত পরিবর্তন বা বিভিন্ন শারীরিক কারণে কোষে ম্যালিগন্যান্সি তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা জানাচ্ছে ভিন্ন কথা। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত জার্নাল The Lancet Oncology-তে প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ভারতে বছরে আনুমানিক ১ লক্ষ ৯০ হাজার ক্যান্সার আক্রান্তের সঙ্গে সরাসরি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের যোগসূত্র রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ২০২৪ সালে যত নতুন ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে (প্রায় ২৩ লক্ষ), তার প্রায় ১২ শতাংশের নেপথ্যেই রয়েছে কোনো না কোনো জীবাণু সংক্রমণ।
ভারতে সংক্রামক ক্যান্সারের মূল ভিলেন কারা?
গবেষণায় মোট ১২টি অনুজীব বা জীবাণুর ওপর বিশ্লেষণ করা হলেও মূলত ৫টি জীবাণুই অধিকাংশ সংক্রমণজনিত ক্যান্সারের জন্য দায়ী:
- হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV): ভারতে এই ভাইরাসটি জরায়ুমুখের ক্যান্সার বা সারভিক্যাল ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ।
- এইচ পিলোরি (H. pylori): পাকস্থলীর এই ব্যাকটেরিয়াটির কারণে ভারতে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, যার সিংহভাগই গ্যাস্ট্রিক বা পাকস্থলীর ক্যান্সার।
- এপস্টিন বার ভাইরাস (EBV): এই ভাইরাসের কারণে প্রায় ২২ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
- হেপাটাইটিস বি ও সি (Hepatitis B & C): মূলত দীর্ঘদিনের লিভার সংক্রমণ থেকে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। হেপাটাইটিস বি-এর কারণে প্রায় ১০ হাজার এবং হেপাটাইটিস সি-এর দরুন প্রায় ৫,৩০০ জন লিভার ক্যান্সারে (বিশেষ করে হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা) আক্রান্ত হয়েছেন।
‘গ্লোবাল ক্যান্সার অবজারভেটরি’ (GLOBOCAN)-এর পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে প্রতি বছর মোট ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ১২ শতাংশই এই সমস্ত সংক্রমণজনিত কারণে আক্রান্ত হন।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও ২০৫০ সালের ভবিষ্যৎ বাণী
বিশ্বের মোট সংক্রমণ-সম্পর্কিত ক্যান্সার রোগীদের ৭৭ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। পূর্ব এশিয়াতেই বিশ্বের প্রায় ৪২ শতাংশ (৯.৯ লক্ষ) এমন কেস দেখা গেছে। অন্যদিকে, সাব-সাহারান আফ্রিকায় মোট ক্যান্সারের এক-চতুর্থাংশই সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত—যার মধ্যে এইচপিভি-জনিত ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের অনুমান, বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারের বার্ষিক সংখ্যা ২০২৪ সালের ২ কোটি থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ৩.৫ কোটিতে গিয়ে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিরোধের সহজ উপায়: সচেতনতাই একমাত্র চাবিকাঠি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিলে এই ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ কমানো সম্ভব:
- টিকা গ্রহণ: এইচপিভি (HPV) এবং হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B)—এই দুটি মারাত্মক সংক্রমণের প্রতিরোধক টিকা সহজেই পাওয়া যায়। সময়মতো টিকাকরণ করলে সারভিক্যাল ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
- ‘Triple H’ স্ক্রিনিং: গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা (অ্যান্টেনাটাল ক্লিনিক), ব্লাড ব্যাঙ্ক এবং যেকোনো বড় অস্ত্রোপচারের আগে এইচসিভি (HCV), এইচআইভি (HIV) ও এইচবিভি (HBV)-এর পরীক্ষা অর্থাৎ ‘Triple H’ স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা দরকার।
- পরীক্ষা ও দ্রুত চিকিৎসা: এইচ পিলোরি ব্যাকটেরিয়া বা হেপাটাইটিস সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নিলে তা ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার সুযোগ পায় না।
- নিরাপদ জীবনযাপন: নিরাপদ ইনজেকশন ব্যবহার, যৌন সুরক্ষায় কন্ডোমের ব্যবহার এবং প্রি-ক্যান্সারাস ক্ষত সময়মতো শনাক্ত করতে স্ক্রিনিং করানো অত্যন্ত জরুরি।
সংক্রমণজনিত ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকাকরণ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিকল্প নেই। সময়মতো সচেতনতাই পারে মারণব্যাধি ক্যান্সারকে জয় করতে।