বকেন বয়স্ক পুরুষের প্রেমেই পাগল হন অল্পবয়সী তরুণীরা? পুরাণ, বিজ্ঞান এবং বাস্তবতার এক গভীর বিশ্লেষণ

সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে একটি মেডিক্যাল কলেজের এক অধ্যাপকের কাণ্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। লেকচার চলাকালীন পুরো ব্যাচের সামনে নিজের এক ছাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া এবং ছাত্রীর সশব্দে ‘না’ বলা ও সহপাঠীদের জুতো হাতে তেড়ে যাওয়ার ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বিচ্ছিন্ন এবং চরম অস্বস্তিকর ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সমাজতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, এটি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। বয়সে অনেক ছোট নারীর প্রতি বয়স্ক বা ক্ষমতাবান পুরুষের আকর্ষণ একটি অতি প্রাচীন আখ্যান, যার শেকড় পুরাণ, বিবর্তনীয় জীববিদ্যা এবং মানুষের অবচেতন মনস্তত্ত্বের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত।
তারকাদের জীবন এবং ‘ট্রফি ওয়াইফ’ সংস্কৃতি
হলিউড থেকে বলিউড—সর্বত্রই এই প্রবণতার উদাহরণ ছড়ানো রয়েছে। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর (৫০) সঙ্গে ২৭ বছর বয়সী মডেলের প্রেম, কিংবা টোবি ম্যাগুয়ারের তাঁর মেয়ের বয়সী কারও সঙ্গে সম্পর্ক কোনো নতুন খবর নয়। কানিয়ে ওয়েস্ট ও বিয়াঙ্কা সেনসোরির ১৭ বছরের ব্যবধান, কিংবা রবার্তো কাভালির জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ৫৫ বছরের ছোট সঙ্গিনীকে বেছে নেওয়া প্রমাণ করে যে, সমাজে যখন অর্থ, প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতার প্রাচুর্য থাকে, তখন বয়সের ব্যবধান গৌণ হয়ে যায়। বিজয় মালিয়া বা কবির বেদীও একই পথে হেঁটেছেন। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে, যেমন মিলিন্দ সোমান এবং অঙ্কিতা কোনওয়ার। ২৬ বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়েছেন ফিটনেস এবং জীবনবোধের মিল থাকার কারণে। কিন্তু বেঙ্গালুরুর সেই অধ্যাপকের হয়তো কোনো ব্যক্তিগত জেট বা গ্ল্যামার নেই, তবুও তিনি সমাজের সেই চিরপরিচিত পিতৃতান্ত্রিক ছকেই পা মিলিয়েছেন, যেখানে একজন পুরুষ মনে করেন কমবয়সী নারী তাঁর ‘অধিকার’ বা ‘সাফল্যের পুরস্কার’।
পুরাণ ও সাহিত্যের আয়নায় নারী ও ক্ষমতা
বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের তত্ত্ব আসার বহু আগে থেকেই কল্পকাহিনী ও পুরাণে এই প্রবণতার উল্লেখ রয়েছে। গ্রিক দেবতাদের রাজা জিউস বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও যৌবনের দেবী হেবি-র (যার অর্থ জীবনের প্রস্ফুটন) প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আবার রোমান কবি ওভিদের ‘মেটামরফোসেস’ কাব্যে পিগম্যালিয়ন নামক ভাস্করের গল্পটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজের হাতে হাতির দাঁত দিয়ে এক আদর্শ নারীর মূর্তি গড়েন এবং তার প্রেমে পড়েন। এটি আসলে পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের এক গভীর রূপক—যেখানে পুরুষ এমন এক নারীকে আকাঙ্ক্ষা করে, যাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো রূপ দিতে পারবে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং যে হবে তার প্রতি শর্তহীনভাবে অনুগত।
ডারউইনের তত্ত্ব এবং বিবর্তনীয় জীববিদ্যা
১৯৮৯ সালে মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস ৩৭টি ভিন্ন সংস্কৃতির ১০,০০০ জনেরও বেশি মানুষের ওপর একটি বিস্তারিত গবেষণা চালান। সেই গবেষণার ফলাফল ছিল চমকপ্রদ এবং বিশ্বজনীন। দেখা যায়, পুরুষেরা সর্বদাই কম বয়সী এবং প্রজনন ক্ষমতাসম্পন্ন নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, অন্যদিকে নারীরা সম্পদশালী এবং স্থিতিশীল বয়স্ক পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেশি পছন্দ করে। বিবর্তনীয় জীববিদ্যা অনুযায়ী, পুরুষের অবচেতন মন এমন সঙ্গিনী খোঁজে যার মধ্যে স্বাস্থ্য ও উর্বরতার লক্ষণ (যেমন তারুণ্য) স্পষ্ট, যাতে তাদের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে, নারীরা প্রাচীনকাল থেকেই এমন সঙ্গী খুঁজে এসেছে যে তাকে ও তার সন্তানকে সুরক্ষা এবং রসদ জোগাতে পারবে। যদিও আধুনিক যুগে আমরা আর গুহাবাসী নই, তবুও সেই আদিম প্রবৃত্তিগুলো আমাদের অবচেতনে রয়ে গেছে।
মনস্তাত্ত্বিক কারণ: কেন বয়স্ক পুরুষরা কমবয়সী নারীদের দিকে ঝোঁকেন?
১. মধ্যজীবনের সংকট বা ‘মিড-লাইফ ক্রাইসিস’ এবং যৌবন ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষেরা যখন জীবনের সীমাবদ্ধতা এবং বার্ধক্যের পদধ্বনি শুনতে পান, তখন অনেকেই মানসিক সংকটে ভোগেন। একজন কমবয়সী, প্রাণবন্ত নারীর সান্নিধ্য তাঁদের মনে এক প্রকার ‘ভ্রম’ বা ইলিউশন তৈরি করে যে, তাঁরাও হয়তো এখনও তরুণ রয়েছেন। কমবয়সী সঙ্গিনীর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের হারানো যৌবন, শক্তি এবং উদ্দীপনা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। এটি অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক প্রজেকশন।
২. ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং নিয়ন্ত্রণের বাসনা
সমবয়সী বা বয়স্ক নারীদের জীবনের প্রচুর অভিজ্ঞতা থাকে, তাঁদের নিজস্ব সুস্পষ্ট মতামত, গণ্ডি (boundaries) এবং চাহিদা থাকে। তাঁরা সহজেই কোনো পুরুষের ভুলত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। অন্যদিকে, একজন কমবয়সী নারীর অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম থাকায় বয়স্ক পুরুষরা তাঁদের ওপর সহজেই মানসিক ও আর্থ-সামাজিক আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন। “ঝগড়া থেকে দূরে থাকা” বা “তারা খুঁতখুঁত করে না”—এই যুক্তিগুলোর আড়ালে মূলত সমকক্ষ কারও সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ভয় এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বাসনাই লুকিয়ে থাকে।
৩. চাপমুক্ত সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি
জীবনের মাঝপথে পৌঁছে অনেক পুরুষই পেশাগত চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং জটিলতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। একজন তরুণীর জীবনে সেই জটিলতাগুলো ততটা প্রকট থাকে না। তাঁদের উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং জীবনের প্রতি রোমাঞ্চকর মনোভাব বয়স্ক পুরুষদের একঘেয়ে জীবনে সতেজ বাতাসের মতো কাজ করে। এটি তাঁদের দৈনন্দিন মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।
৪. শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং সমাজ-নির্ধারিত সৌন্দর্যবোধ
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের তারুণ্য এবং শারীরিক সৌন্দর্যকে সবসময়ই অতিরিক্ত মহিমান্বিত করা হয়েছে। পুরুষরা মনে করেন কমবয়সী নারীরা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং উদ্যমী হন। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক পুরুষদের যৌন জীবনে এক নতুন রোমাঞ্চ ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে।
পরিশেষে বলা যায়, দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং ভালোবাসার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যেকোনো সম্পর্কই সুন্দর, সেখানে বয়সের ব্যবধান যাই হোক না কেন। কিন্তু যখন সেই সম্পর্কের মূলে থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিজের হারানো যৌবন খোঁজার মরিয়া চেষ্টা কিংবা আসাম মানসিক আধিপত্য বিস্তারের বাসনা—তখন তা বেঙ্গালুরুর ওই ঘটনার মতোই অস্বস্তিকর এবং অনভিপ্রেত হয়ে দাঁড়ায়।