প্রকৃতির প্রতিশোধ? হারিয়ে যাচ্ছে কাশ্মীরের ৭৪% হ্রদ, ঘনিয়ে আসছে মহাবিপর্যয়!

প্রকৃতির প্রতিশোধ? হারিয়ে যাচ্ছে কাশ্মীরের ৭৪% হ্রদ, ঘনিয়ে আসছে মহাবিপর্যয়!

জম্মু-কাশ্মীরের ভূস্বর্গ আজ এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব পরীক্ষক (CAG)-এর সাম্প্রতিক এক অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কাশ্মীরের শত শত হ্রদ ও জলাভূমি দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যা উপত্যকার বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

জলাভূমি হ্রাসের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

সিএজি-র অডিট অনুযায়ী, জম্মু-কাশ্মীরে জরিপ করা ৬৯৭টি জলাশয়ের মধ্যে ৫১৮টি (প্রায় ৭৪ শতাংশ) হয় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে অথবা আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

  • ৩১৫টি হ্রদ মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে।
  • ২০৩টি হ্রদের আয়তন প্রায় ১,৩১৪ হেক্টর কমে গেছে।
  • ৬৩টি জলাশয় তাদের মূল আয়তনের অর্ধেকেরও বেশি হারিয়ে আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালাচ্ছে।

সংকটের নেপথ্যে মূল কারণ

ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়ের জন্য কেবল প্রকৃতি নয়, মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত হস্তক্ষেপই প্রধানত দায়ী। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং অবৈধ দখলের ফলে জলাভূমিগুলো আজ জনবসতি বা কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তর যেমন বন বিভাগ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এবং হ্রদ সংরক্ষণ বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে এই দুর্গতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গৃহস্থালির বর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি জলাশয়ে পড়ার ফলে জল ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব

জলাভূমি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাশ্মীরের জলবায়ুর ওপর। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, শীতকালে অপর্যাপ্ত তুষারপাত এবং গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে হিমবাহগুলো দ্রুত গলতে শুরু করেছে। এর ফলে উপত্যকাটি এখন যেকোনো সময় বন্যা, মেঘ ভাঙা বৃষ্টি বা খরার মতো দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ ছিল এই প্রাকৃতিক ‘বাফার’ বা জলাশয়গুলোর অনুপস্থিতি, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির জল ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল।

দায়িত্ব নিতে হবে সকল পক্ষকে

জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই রিপোর্টকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শ্রীনগর থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকা—সবখানেই জলর উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ডাল বা উলারের মতো বড় হ্রদগুলোর দিকে নজর দেওয়া হলেও ছোট ছোট অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় এখন অবহেলিত। তিনি সাধারণ মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্লাস্টিক বর্জন এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে এই ধ্বংস রুখতে। এটি কেবল সরকারের একার কাজ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার লড়াই।

একঝলকে

  • কাশ্মীরের ৬৯৭টি জলাশয়ের মধ্যে ৫১৮টি এখন বিলুপ্তির পথে।
  • ৩১৫টি হ্রদ মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে।
  • গত কয়েক দশকে ২০৩টি হ্রদের আয়তন ১,৩১৪ হেক্টর হ্রাস পেয়েছে।
  • নগরায়ণ, অবৈধ দখল এবং সরকারি সমন্বয়হীনতা এই সংকটের প্রধান কারণ।
  • প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ বা জলাভূমি কমে যাওয়ায় বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
  • হিমবাহের দ্রুত গলন পরিবেশের জন্য পারমাণবিক হুমকির চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *