বাঙালির মরণ-বাঁচন লড়াই: ২০২৬-এর ভোট কি দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘বদলার’ ডাক?

বাঙালির মরণ-বাঁচন লড়াই: ২০২৬-এর ভোট কি দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘বদলার’ ডাক?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রাজনীতির আঙিনা এখন কেবল হার-জিতের পাটিগণিত নয়, বরং এক চরম ‘প্রতিরোধের’ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল সরকার গড়ার লড়াই নয়, বরং বাঙালির আত্মসম্মান, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অধিকার রক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষা। যে আবেগকে পুঁজি করে তৃণমূল কংগ্রেস প্রচার চালাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে দিল্লির ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা।

প্রতিরোধের ভোট: বিভাজন ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে শপথ

এবারের ভোটকে দেখা হচ্ছে দাঙ্গা এবং বিভাজনের রাজনীতিকে চিরতরে নির্মূল করার এক প্রতিজ্ঞা হিসেবে। বাংলার ইতিহাস বলছে, গত ৮০ বছরে আটজন মুখ্যমন্ত্রীর কেউই কোনো সিদ্ধান্তের জন্য দিল্লির মুখাপেক্ষী হননি। ‘বাঙালির পণ, বাঙালির আশা’—এই মন্ত্রকে পাথেয় করে ভোটারদের মনে এই বার্তাই গেঁথে দেওয়া হচ্ছে যে, বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ হবে এই মাটির থেকেই, দিল্লি থেকে নয়। রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় যে ধর্মীয় মেরুকরণের ছায়া ফেলার চেষ্টা হয়েছে, এবারের জনমত তার বিরুদ্ধে এক শক্ত পাঁচিল হয়ে দাঁড়াতে চায়।

প্রতিবাদের ভোট: বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার পাল্টা জবাব

বাঙালিকে যখন অন্য রাজ্যে মাতৃভাষা বলার অপরাধে হেনস্তা হতে হয়, তখন কেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে কোনও কড়া বার্তা আসে না—এই প্রশ্নই এখন মুখে মুখে। প্রধানমন্ত্রীর ঝালমুড়ি খাওয়া বা গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণকে ‘ট্যুরিস্ট পলিটিক্স’ বলে কটাক্ষ করছে শাসকদল।

  • অর্থনৈতিক বঞ্চনা: বুলেট ট্রেন থেকে এক্সপ্রেসওয়ে, সেমিকন্ডাক্টর কারখানা থেকে বন্দে ভারত নির্মাণের অর্ডার—সবই যখন অন্য রাজ্যগুলোর ঝুলিতে যাচ্ছে, তখন বাংলার ঝুলি কেন শূন্য?
  • ভাতে মারার রাজনীতি: ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ, আবাসের টাকা আটকে দেওয়া এবং পানীয় জলের প্রকল্পে অসহযোগিতাকে বাঙালি ‘ভাতে মারার’ চক্রান্ত হিসেবে দেখছে। আর এই না-পাওয়ার পুঞ্জীভূত ক্ষোভই এখন ‘প্রতিবাদ’ নাম নিয়ে ব্যালট বাক্সে আছড়ে পড়তে চলেছে।

প্রত্যাঘাতের ভোট: খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত

বাঙালির খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে ধর্মীয় আচার—সবকিছুর ওপর উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে এক প্রচ্ছন্ন লড়াই শুরু হয়েছে।

  • আমিষ বনাম নিরামিষ: ভিন রাজ্যে নবরাত্রি বা উৎসবে জোর করে মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখার যে সংস্কৃতি, তা বাংলায় আমদানির চেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে সাধারণ মানুষ।
  • দ্বিচারিতা: দিল্লিতে আমিষভোজী বাঙালিকে অপবিত্র বলা আর কলকাতায় এসে মাছ খেতে খেতে ভিডিও করা—এই রাজনৈতিক দ্বিচারিতার জবাব দিতে তৈরি ভোটাররা।

প্রতিশোধের ভোট: এসআইআর এবং ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক

২৭ লক্ষ মানুষকে অনাগরিক করে দেওয়ার আশঙ্কা এবং এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার নামে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিনা অপরাধে বিএলও-দের আত্মহত্যা বা পরিচয় হারানোর আতঙ্কে দিন কাটানো মানুষদের কাছে এই ভোট এখন ‘প্রতিশোধের’ অস্ত্র। নিজেদের দেশেই ‘পরবাসী’ হয়ে যাওয়ার যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠছে, তাকে রুখতে ব্যালটই এখন শেষ ভরসা।

বাংলার ইতিহাসে এই প্রথমবার ভোট কেবল উন্নয়নের নিরিখে নয়, বরং হারানো সম্মান ফিরে পাওয়ার এক ‘প্রত্যাঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ৪ মে-র ফলাফলই বলে দেবে, বাঙালির এই ‘প্রতিরোধের’ ডাক কতটা সফল হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *