এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি কোটি টাকা খরচ, তবু বাংলার মহারণে শেষ ভরসা সেই রাস্তাই!

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের আগে প্রচারের শেষ লগ্নে এক অদ্ভুত সমীকরণ দেখা গেল বাংলায়। একদিকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সোশ্যাল মিডিয়া আর ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা ঢালছে রাজনৈতিক দলগুলো, ঠিক তখনই প্রচারের অন্তিম কয়েক ঘণ্টায় সব হেভিওয়েটদের দেখা গেল রাস্তার ধুলোবালি মেখেই জনসংযোগ সারতে। ডিজিটাল প্রচারের রমরমার মাঝেও বাংলার মাটির লড়াইয়ে ‘রোড-শো’ আর ‘পদযাত্রা’ যে এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সোমবারের চিত্র সেই রাজনৈতিক বাস্তবকেই প্রমাণ করল।
হেভিওয়েটদের শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ
সোমবার, ২৭ এপ্রিল বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছিল প্রচারের সময়সীমা। এই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রণংদেহি মেজাজে দেখা গিয়েছে শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষকেই।
- বিজেপি: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ব্যারাকপুরের ভাটপাড়ায় বিশাল জনসভা করেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দেখা যায় বেহালায় রোড-শো এবং চন্দননগরে বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে প্রচার সারতে। এছাড়া শুভেন্দু অধিকারী একবালপুর ও ভবানীপুরে এবং মিঠুন চক্রবর্তী হাওড়ায় প্রার্থীর হয়ে শেষ মুহূর্তের প্রচার করেন।
- তৃণমূল কংগ্রেস: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাদবপুরের সুকান্ত সেতু থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত দীর্ঘ পদযাত্রা করেন, যেখানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হরিণঘাটা ও আরামবাগে সভা করে দলের শক্তি প্রদর্শন করেন। বিনোদন ও রাজনীতির মিশেলে শ্রীরামপুরে প্রচারে ঝড় তোলেন সুপারস্টার দেব।
ডিজিটাল পাটিগণিত: কোটি কোটি টাকার লড়াই
মাঠের লড়াইয়ের সমান্তরালে চলেছে অনলাইন যুদ্ধের এক বিশাল আয়োজন। গুগল এবং মেটা-র তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিজ্ঞাপনের খরচ গত এক দশকের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
- বিজেপি: গত ২৫ জানুয়ারি থেকে ২৪ এপ্রিলের মধ্যে বিজেপি অনলাইনে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রায় ৪০ কোটি টাকারও বেশি খরচ করেছে। যার একটি বড় অংশই বাংলার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে তৈরি। বিজেপি মূলত তাদের অফিশিয়াল পেজ থেকেই এই প্রচারণা চালাচ্ছে।
- তৃণমূল কংগ্রেস: তৃণমূল মূলত ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের (মেটা) ওপর বেশি জোর দিয়েছে। তাদের অফিশিয়াল এবং থার্ড-পার্টি পেজ (যেমন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেজ ও অন্যান্য সমর্থক পেজ) মিলিয়ে প্রায় ৩.৫ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
এআই বনাম রাস্তার আবেগ
ডিজিটাল মার্কেটারদের মতে, এআই বা সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো গেলেও, ভোটারদের মন জয় করার বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে সরাসরি জনসংযোগের কোনও বিকল্প নেই। সে কারণেই শেষ বেলায় প্রযুক্তির ঘেরাটোপ ছেড়ে রাজপথকেই বেছে নিয়েছেন মোদী-মমতা-শাহরা। বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল গ্রাফিক্সের চেয়ে ‘ঘরের মেয়ে’ বা ‘জননেতা’কে চোখের সামনে দেখার আবেগ যে অনেক বেশি কার্যকর, তা এদিনের জনপ্লাবনই বুঝিয়ে দিয়েছে।
আগামীকাল ২৯ এপ্রিল ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ। এখন দেখার এই ডিজিটাল হাইপ আর রাস্তার আবেগের মিশেলে বাংলার মানুষ কার হাতে নবান্নের চাবিকাঠি তুলে দেন।
প্রতিবেদক: স্বাধীন মানব দাস।
ডিজিটাল দুনিয়ার এই অঢেল বিজ্ঞাপনী প্রচার কি আপনার মনে হয় সাধারণ ভোটারের ভোটদানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, নাকি বাংলার ভোটাররা এখনও সশরীরে দেখার আবেগেই বিশ্বাসী?