ব্যারকা পরমাণু কেন্দ্রে ড্রোন হামলা ঘিরে চরম উত্তেজনা, তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কায় কাঁপছে ভারতও

সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) আবু ধাবি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ব্যারকা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে আকস্মিক ড্রোন হামলায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম এশিয়ায়। রবিবার দুপুরে আল ধাফরা অঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি লক্ষ্য করে তিনটি ড্রোন ছোড়া হয়। প্রতিরক্ষাবাহিনী আকাশেই দুটি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও তৃতীয়টি কেন্দ্রের সীমানার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আঘাত হানে। এর ফলে সেখানে আগুন ধরে গেলেও কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি। স্বস্তির বিষয় এই যে, প্রাথমিক আশঙ্কার পর দেখা গেছে ওই এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় ২০২০ সালে নির্মিত এই ব্যারকা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির পরিচ্ছন্ন শক্তি কৌশলের মূল ভিত্তি। এটি একা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ (বছরে ৪০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা) সরবরাহ করে। স্বভাবতই এই হামলাকে আমিরশাহি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। তাদের অভিযোগ, দেশের পশ্চিম সীমান্ত থেকে ইরান বা ইরান-মদতপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠন এই ‘সন্ত্রাসী হামলা’ চালিয়েছে। হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আমিরশাহি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, উপযুক্ত জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে হুথি বিদ্রোহী এবং পরবর্তীতে ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই অঞ্চলে হামলা চালালেও, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ঘটনা এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় পাল্টা আঘাতের রণধ্বনি
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলা পশ্চিম এশিয়ার সামরিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিতে পারে। ইতঃপূর্বে ইরান এবং ইজরায়েল-আমেরিকার মধ্যে সংঘাতের জেরে ইরানের নাতান্জ় পরমাণুকেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এবার আমিরশাহির পরমাণু কেন্দ্রে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। আমিরশাহি যদি পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের কোনো পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হানে, তবে তা সমগ্র অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। একদিকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হচ্ছে না; অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরেনিয়াম সমর্পণ ও ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনমনীয় শর্তের কারণে মধ্যস্থতা থমকে আছে। এরই মাঝে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট ‘ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা’ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের ওপর সম্ভাব্য মারাত্মক প্রভাব
এই পরমাণু সংঘাত কেবল পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়তে পারে ভারতীয় উপমহাদেশে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ইরান বা আরব আমিরশাহির পরমাণুকেন্দ্রে বড় কোনো ধ্বংসাত্মক হামলার কারণে যদি ‘নিউক্লিয়ার ফলআউট’ বা পারমাণবিক পতন ঘটে, তবে সেই তেজস্ক্রিয়তা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হওয়ার কারণে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে সেই বিষাক্ত বাতাস ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এবং উত্তর ভারতে প্রবেশ করতে পারে।
আবার আমিরশাহির কেন্দ্র থেকে বিকিরণ ছড়ালে তা ওমান ও ইয়েমেন হয়ে দক্ষিণ ভারতে আঘাত হানবে। এর ফলে ভারতে মারাত্মক বায়ুদূষণ, অ্যাসিড বৃষ্টি এবং কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। মানবদেহে তেজস্ক্রিয়তার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে ভারতীয়দের দীর্ঘদিনের জন্য ঘরের ভেতরে বন্দি জীবন কাটাতে হতে পারে। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা মাথায় রেখে বিশ্বজুড়ে এখন একটাই দাবি উঠেছে— অবিলম্বে পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে যুদ্ধ ও হামলার আওতামুক্ত রাখা হোক।