ডাকাতির ছক ও শিক্ষক নিগ্রহে যোগসাজশ, পুলিশের জালে তৃণমূলের ছাত্র নেতা
রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকার গঠনের পর জেলায় জেলায় দুর্নীতিগ্রস্ত ও বাহুবলী নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এবার ডাকাতির ব্লু-প্রিন্ট তৈরি ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বাঁকুড়া থেকে গ্রেফতার হলেন তৃণমূলের এক প্রভাবশালী ছাত্র নেতা। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত যুবকের নাম সুরজ বক্স, যিনি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) বাঁকুড়া শহর সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
সোমবার গভীর রাতে বাঁকুড়া সদর থানার পুলিশ স্কুলডাঙা এলাকার নিজস্ব বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার দুপুরে সুরজকে বাঁকুড়া জেলা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ করে ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতের (Police Custody) নির্দেশ দেন।
ধৃত ডাকাতদের জেরা করতেই ফাঁস হলো টিএমসিপি নেতার নাম
বাঁকুড়া সদর থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১২ই মে গভীর রাতে রাজগ্রাম শ্যামডাঙার খাদি কেন্দ্র সংলগ্ন একটি ফাঁকা অন্ধকার রাস্তায় একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বাঁকুড়া থানার পুলিশ সেখানে অতর্কিতে হানা দেয়। পুলিশি তৎপরতায় ঘটনাস্থল থেকে সুরজিৎ প্রামাণিক এবং আকাশ গরাই নামে দুই দাগী অপরাধীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়, বাকিরা অন্ধকারে চম্পট দেয়।
লক-আপে রেখে ওই দুই দুষ্কৃতীকে টানা জেরা করতেই উঠে আসে টিএমসিপি নেতা সুরজ বক্সের নাম। ধৃতেরা ইডির ধৃত সোনা পাপ্পুর সিন্ডিকেটের মতোই স্বীকার করেছে যে, এলাকায় বড়সড় ডাকাতির ছক ও যাতায়াতের রুট ম্যাপ তৈরি করার পেছনে সুরজ বক্সের সক্রিয় যোগসাজশ ও মদত ছিল।
আগেও শিক্ষক ও যৌথ মঞ্চের নেতাকে রাস্তায় ফেলে পেটানোর অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, সুরজ বক্সের দাদাগিরি বাঁকুড়া শহরে নতুন কিছু নয়। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বকেয়া ডিএ (DA) আন্দোলনের সাথে যুক্ত ‘সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের’ এক প্রবীণ প্রাথমিক শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীকে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে নির্মমভাবে মারধর করার মূল অভিযোগ উঠেছিল এই ছাত্র নেতার বিরুদ্ধে।
তৎকালীন শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকায় এবং আদালত থেকে তড়িঘড়ি আগাম জামিন (Anticipatory Bail) নেওয়ায় সে যাত্রায় পুলিশ তাঁকে ছুঁতে পারেনি। এদিন আদালতে ঢোকার মুখে সুরজ অবশ্য দাবি করেন, “শিক্ষক মারধরের মামলায় আমি জামিনে আছি। কেন পুলিশ আমাকে হুট করে মাঝরাতে তুলে আনল, আমি কিছুই জানি না।”
আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক চক্রান্তের পাল্টা তত্ত্ব আইনজীবীর
সুরজের পক্ষের আইনজীবী অভিষেক বিশ্বাস আদালতে জামিনের সওয়াল করতে গিয়ে রাজনৈতিক চক্রান্তের তত্ত্ব খাড়া করেন। তিনি দাবি করেন, “আমার মক্কেল একজন প্রথম সারির ছাত্র নেতা। ১৩ই মে-র যে ডাকাতির মামলার কথা পুলিশ বলছে, তার সাথে সুরজের দূরদূরান্তের কোনো যোগাযোগ নেই। রাজ্যে সরকার বদল হতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিরোধী দলের যুব নেতৃত্বকে কালিমালিপ্ত করতে এই চক্রান্ত করা হচ্ছে।”
তবে নতুন সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং পুলিশের স্বাধীন ক্ষমতা (Free Hand) পাওয়ার পর বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, অপরাধের সাথে যুক্ত ব্যক্তি কোন দলের পদাধিকারী, তা দেখা হবে না। সুরজকে হেফাজতে নিয়ে এই আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সাথে আর কোনো বড় মাথার আর্থিক লেনদেনের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।