ভিনধর্মী যুগলের বিয়ে, আক্রান্ত আইনজীবী
দেশের প্রচলিত আইন ও বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act) মেনে ভিনধর্মী এক যুবক-যুবতীর রেজিস্ট্রি বিয়ে দেওয়ার জেরে চরম হেনস্থা ও আক্রমণের মুখে পড়লেন শিলিগুড়ি মহকুমার খড়িবাড়ির এক আইনজীবী এবং তাঁর ম্যারেজ রেজিস্ট্রার স্ত্রী। উত্তরবঙ্গের এই স্পর্শকাতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আইনি ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। আক্রান্ত আইনজীবী তথা খড়িবাড়ির প্রাক্তন তৃণমূল নেতা মুকুল সরকারের অভিযোগ, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একদল দুষ্কৃতী তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে এবং তাঁর প্রাইভেট চেম্বারের চাবি কেড়ে নিয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে খড়িবাড়ি থানার পুলিশ।
আইন মেনে বিয়ে করা অপরাধ নয়, ক্ষুব্ধ বার অ্যাসোসিয়েশন
শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উদয়শঙ্কর মালাকার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। একজন আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতার ওপর এই ধরনের হামলাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “বিশেষ বিবাহ আইন বা স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী ভারতের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ভিনধর্মী বা ভিনজাতের যুগল আইনসম্মতভাবে বিয়ে করতে পারেন। যদি সমস্ত সরকারি নিয়ম ও গাইডলাইন মেনে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে কোনো আইনজীবীকে বা রেজিস্ট্রি আধিকারিককে এভাবে নিশানা করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনভিপ্রেত।”
১০ মাস আগের বিয়ে নিয়ে হঠাৎ শোরগোল, রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ
আক্রান্ত আইনজীবী মুকুল সরকার জানান, প্রায় দশ মাস আগে এক ভিনধর্মী যুগল বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করে তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। যেহেতু তাঁর স্ত্রী রাজ্য সরকার মনোনীত একজন রেজিস্টার্ড ম্যারেজ অফিসার, তাই তিনি ওই যুগলকে স্ত্রীর কাছে পাঠান এবং আইন মেনেই তাঁদের বিশেষ বিবাহ সম্পন্ন হয়। মুকুল বাবুর বিস্ফোরক দাবি:
“রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হতেই বিজেপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে কয়েকশো মানুষ ওই পুরোনো ঘটনাকে ইস্যু করে আমাদের ওপর চড়াও হয়। আমাদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক হেনস্থা করা হয়েছে এবং আমার চেম্বারের চাবি এখনও কেড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে।”
আইন হাতে তুলে নেওয়া সমর্থন করে না দল, দাবি বিজেপির
এই হামলার পেছনে বিজেপির যোগসূত্রের অভিযোগ উঠলেও দলের জেলা সভাপতি অরুণ মণ্ডল সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন। পুরো বিষয়টিকে প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, “বিজেপির আদর্শ বা দল কখনই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থন করে না। এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগ নেই। প্রশাসন পুরো ঘটনা তদন্ত করে দেখুক এবং এর নেপথ্যে অন্য কোনো ব্যক্তিগত বা পুরোনো শত্রুতার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কি না, তাও পুলিশি জেরায় খতিয়ে দেখা হোক।”
পুরোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? খতিয়ে দেখছে পুলিশ
এদিকে খড়িবাড়ির স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই ঘটনার পেছনে শুধু বিয়ের বিষয়টিই একমাত্র কারণ নয়। মুকুল সরকার কয়েক বছর আগে পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের ফাঁসিদেওয়া ব্লক সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন এবং সেই সময়ে একাধিক স্থানীয় জমি-জমা বা রাজনৈতিক বিবাদে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। ক্ষমতা বদলের পর পুরোনো কোনো ক্ষোভ থেকেই এই হামলা কি না, তাও ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। শিলিগুড়ি মহকুমা পুলিশ আধিকারিক (SDPO) সৌমিজিৎ রায় জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।