ত্রাণের ত্রিপল ও কিট আত্মসাতের অভিযোগ, সাগরে তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়িতে পুলিশের হানা ঘিরে ধুন্ধুমার
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং কাটমানি-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নবান্নের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ধাক্কা এবার পৌঁছল সুন্দরবনের উপকূলবর্তী এলাকাতেও। সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি ত্রাণের ত্রিপল এবং কিট বেআইনিভাবে নিজের বাড়িতে মজুত করে রাখার গুরুতর অভিযোগে এবার পুলিশের হানার মুখে পড়লেন এক প্রভাবশালী তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর ব্লকের রুদ্রনগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকাল থেকেই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
তৃণমূল সদস্য শেখ মান্নানের বাড়িতে মিলল ১৬টি ত্রিপল ও কিট
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সাগরের জীবনতলা মনসাতলার ১০৬ নম্বর বুথ এলাকার তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য শেখ মান্নানের নিজস্ব বাসভবনে বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণের সামগ্রী লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে খবর ছড়ায়। বিষয়টি জানাজানি হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা।
তাঁরা পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ি ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিজেপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, আমফান, ইয়াস বা সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গরিব মানুষের জন্য সরকারি তহবিল থেকে যে সমস্ত ত্রিপল ও কিট পাঠানো হয়েছিল, তা দুর্নীতির উদ্দেশ্যে বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিলেন ওই তৃণমূল নেতা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাগর থানার পুলিশ ও ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকেরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন এবং শেখ মান্নানের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১৬টি সরকারি ত্রিপল ও বিপুল পরিমাণ কিট হাতেনাতে উদ্ধার করেন।
‘উপভোক্তারা পরিযায়ী শ্রমিক, তাই ত্রিপল আমার কাছে ছিল’: সাফাই শেখ মান্নানের
বাড়িতে পুলিশের হানা এবং ত্রাণসামগ্রী উদ্ধার হওয়া নিয়ে অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তি খাড়া করেছেন অভিযুক্ত তৃণমূল সদস্য শেখ মান্নান। নিজের অপরাধ ঢাকতে সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি দাবি করেন:
“আমার বাড়িতে কোনো অবৈধ ত্রাণ মজুত ছিল না। কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে জৈব সার তৈরি করার জন্য যে বিশেষ কিট দেওয়া হয়, সেগুলিই রাখা ছিল। এই বুথের বেশির ভাগ মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় এবং বর্তমানে ভিন রাজ্যে কাজে থাকায় তাঁরা সময়মতো কিটগুলি নিতে আসেননি। আর কিছু ত্রিপল আমি সব সময়ই আপৎকালীন বা ইমার্জেন্সি পরিস্থিতির জন্য নিজের কাছে তুলে রাখি, যাতে কারও ঘর ভেঙে গেলে দ্রুত দেওয়া যায়।”
যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পঞ্চায়েত সদস্যের এই মৌখিক সাফাই খণ্ডন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি যে কোনো ত্রাণ বা কিট উপভোক্তা না নিলে তা বিডিও (BDO) অফিসে বা পঞ্চায়েত কার্যালয়ের সরকারি স্টোররুমে ফেরত পাঠানোর কথা, কোনোভাবেই তা কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত শোবার ঘরে বা ডেরায় মজুত রাখা যায় না।
উদ্ধার হওয়া সামগ্রী গেল বিডিও অফিসে, কড়া তদন্তের নির্দেশ
এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পুলিশ ও ব্লক প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উদ্ধার হওয়া ১৬টি ত্রিপলসহ সমস্ত কিট বাজেয়াপ্ত করে লরিতে তুলে সরাসরি সাগর ব্লকের বিডিও অফিসে নিয়ে যান। নতুন বিজেপি সরকারের স্পষ্ট নীতি মেনে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি সম্পত্তি বা গরিবের ত্রাণ নিয়ে কোনো রকম নয়ছয় বা দলবাজি বরদাস্ত করা হবে না। এই ঘটনার পেছনে কোনো বড়সড় আর্থিক তছরুপের চক্রান্ত কাজ করছিল কি না এবং বিডিও অফিসের কোনো কর্মীর সাথে শেখ মান্নানের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।