তপ্ত কলকাতা পুরনিগম, সচিবকে হেনস্থার অভিযোগে এবার পুলিশের নজরে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর

কলকাতা পুরনিগমের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংঘাত এবার এক নজিরবিহীন আইনি মোড় নিল। পুরনিগমের সচিবকে অভব্য আচরণ ও হেনস্তা করার অভিযোগে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে তলব করেছে নিউমার্কেট থানার পুলিশ। গত শুক্রবারের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরভবনের অন্দরে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই ঘটনায় মেয়র পারিষদ কি শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হতে চলেছেন?
অধিবেশন ঘিরে সংঘাত ও হেনস্তার অভিযোগ
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার, যখন কলকাতা পুরনিগমের কমিশনার স্মিতা পান্ডে নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। তবে সেই নির্দেশকে উপেক্ষা করেই চেয়ারপার্সন মালা রায়ের উপস্থিতিতে বিকল্প স্থানে অধিবেশন বসে। মূল অধিবেশন কক্ষটি ভিতর থেকে বন্ধ থাকায় কাউন্সিলররা ভিজিটার্স রুমে বসেন। এই অচলাবস্থার মাঝেই অধিবেশন কক্ষ খুলে দেওয়ার দাবিতে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের একটি প্রতিনিধি দল পুরনিগমের সচিবের ঘরে যান। অভিযোগ ওঠে, সেখানে সচিবের সঙ্গে অত্যন্ত অভব্য আচরণ এবং তাঁকে হেনস্তা করা হয়। ঘটনার দিন রাতেই পুরসচিব ও পুর কমিশনার যৌথভাবে নিউমার্কেট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, যার ভিত্তিতে পুলিশ তদন্তে নেমে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে নোটিশ পাঠিয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রশ্ন বনাম প্রশাসনিক কঠোরতা
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, একজন জনপ্রতিনিধি এবং মেয়র পারিষদ হিসেবে বাক-স্বাধীনতা ও অধিকার প্রয়োগের অংশ হিসেবেই তিনি কেবল অধিবেশন কক্ষটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। এটিকে গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন তিনি। অন্যদিকে, রাজ্যের পৌর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি আধিকারিকদের ওপর এই ধরনের হেনস্তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এই ঘটনায় ইতিপূর্বেই সুদীপ পোল্লে নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অন্য এক ‘মিস্টার চ্যাটার্জী’-কে গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর থেকেই বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেফতারির জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
মূলত পুরনিগমের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচিত জনপ্রতিধিদের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং কর্তৃত্বের লড়াই থেকেই এই নজিরবিহীন সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার জেরে কলকাতা পুরনিগমের প্রশাসনিক কার্যকারিতা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। একদিকে যেমন সরকারি আমলা ও আধিকারিকদের মধ্যে একপ্রকার নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পুরবোর্ডের ওপর শাসকদলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ভাবমূর্তি নিয়েও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হচ্ছে। পুলিশের এই পদক্ষেপ এবং পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত আগামী দিনে পুরনিগমের চালিকাশক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।