বাংলায় কর্পোরেট রাজনীতির ইতি, কলকাতা থেকে এবার পাকাপাকিভাবে পাততারি গোটাল আইপ্যাক

তিলোত্তমার রাজনৈতিক মাটি থেকে কার্যত মুছে গেল কর্পোরেট রাজনীতির অধ্যায়। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় শাসকদলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC) এবার কলকাতা থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় নিল। সল্টলেকের অফিসে ভোটের মাঝপথেই তালা ঝোলানোর পর এবার কর্মীদের ছাঁটাই ও দক্ষিণ ভারতে বদলি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একটি পেশাদার সংস্থার ওপর অতি-নির্ভরশীলতাই বাংলায় শাসকদলের সাম্প্রতিক ভরাডুবির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও কাকলির ইস্তফা
আই-প্যাকের এই ডেরা তোলার আবহেই শাসকদলের অন্দরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। পরাজয়ের ‘নৈতিক দায়’ নিয়ে রাজ্য সভাপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। চিঠিতে সরাসরি নাম না নিলেও তাঁর নিশানা যে ছিল ভোটকুশলী সংস্থা, তা স্পষ্ট। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছেন, “ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় না।” দলের একাংশের মতে, একটি পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কাঠামো ও নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, যার খেসারত দিতে হলো ২০২৬ সালের নির্বাচনে।
মেশিন লার্নিং বনাম মাটির আবেগ
উনিশের লোকসভা নির্বাচনের পর বাংলায় তৃণমূলের বৈতরণী পার করতে প্রশান্ত কিশোরের আই-প্যাকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন শীর্ষ নেতৃত্ব। একুশের সাফল্যের পর এই সংস্থাই দলের অন্দরে ‘থার্ড পাওয়ার সেন্টার’ বা তৃতীয় শক্তিতে পরিণত হয়। ল্যাপটপ ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে দলের দীর্ঘদিনের আবেগ ও মাটির বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে প্রবীণ নেতাদের একাংশ সরব হয়েছেন। রাজনীতিকে এভাবে ‘আউটসোর্স’ করার ফলে জেলা ও ব্লক স্তরের অভিজ্ঞ নেতাদের ওপর আই-প্যাকের নবীন কর্মীদের খবরদারি বাড়ছিল, যা দলের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।
কেন্দ্রীয় তদন্ত ও আইনি জটিলতা
সংস্থার এই বিদায়ের নেপথ্যে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্ত ও আইনি জটিলতাও বড় ভূমিকা নিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সল্টলেকের আই-প্যাক দফতর এবং সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। পরবর্তীতে ভোটের মাঝেই আই-প্যাকের আরেক প্রতিষ্ঠাতা ভিনেশ চান্ডেলকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। এই ধারাবাহিক তদন্ত ও আইনি টানাপোড়েনের জেরে সংস্থায় বড়সড় ধাক্কা লাগে। সব মিলিয়ে, বাংলায় কর্পোরেট ধাঁচে দল পরিচালনার যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল, আই-প্যাকের কলকাতা ত্যাগের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত অবসান ঘটল।