আরব দুনিয়ার সংঘাতে ভারতের ঢাল অর্থমন্ত্রীর তিন ‘F’ ফর্মুলা

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া চরম অস্থিরতার প্রভাব এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে ভারতের অর্থনীতিতে। তবে আন্তর্জাতিক এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সোমবার এক অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর কেন্দ্র কড়া নজর রাখছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার মূলত তিনটি ‘F’ অর্থাৎ ফুয়েল (জ্বালানি), ফার্টিলাইজার (সার) এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ (বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার)—এই তিনটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভিত যথেষ্ট শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চ্যালেঞ্জের মুখে জ্বালানি ও সার
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েনে ভারতের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার জেরে দেশীয় বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহে দফায় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ার পর সোমবারও লিটার প্রতি পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আড়াই টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম এমন এক নজিরবিহীন স্তরে পৌঁছেছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। এর পাশাপাশি সোনার লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানি খরচ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই সম্প্রতি পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র, যার ফলে সরকারের প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তবুও সাধারণ মানুষের ওপর থেকে আর্থিক বোঝা কমাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন।
আস্থার পরিবেশ ও ক্ষুদ্র শিল্পের সুরক্ষা
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক ধরনের কৃত্রিম হতাশা ও নৈরাশ্যের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর সিংহভাগই বাহ্যিক কারণে সৃষ্ট। তাই আতঙ্ক না ছড়িয়ে কথাবার্তা ও কাজের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প সংস্থাগুলির (MSME) বকেয়া পাওনা দ্রুত মেটানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই শিল্পগুলির প্রায় ৮ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এই তারল্য সংকট কাটাতে সমস্ত সরকারি সংস্থাকে নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্পের পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আগামী দিনে দেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে। সেই কারণেই আগাম সতর্কতা হিসেবে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও সোনা কেনা কমানোর যে পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।