নেতাদের দম্ভ ভাঙতে ‘ডিম-অস্ত্র’! অভিষেক থেকে ম্যাক্রঁ—কেন বিশ্ব রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসে এই ‘ডিম্ব-বিপ্লব’?

নেতাদের দম্ভ ভাঙতে ‘ডিম-অস্ত্র’! অভিষেক থেকে ম্যাক্রঁ—কেন বিশ্ব রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসে এই ‘ডিম্ব-বিপ্লব’?

সোনারপুরের রাস্তায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদা জামায় লেগে থাকা ডিমের কুসুমের দাগ হয়তো ধুয়ে যাবে, কিন্তু বাংলার রাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলের ইতিহাসে এই ‘ডিম্বাস্ত্র’ এক মস্ত বড় মাইলফলক হয়ে থেকে গেল। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিবাদের এই ভাষা বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত পুরনো ও বিতর্কিত।

কেন প্রতিবাদে ‘ডিম’ বেছে নেয় জনতা?

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ডিমের চেয়ে সস্তা এবং ‘অহিংস’ প্রতিবাদের অস্ত্র আর দুটো নেই। পাথর ছুড়লে বা জুতো মারলে নেতাদের শরীরে বড় আঘাত লাগতে পারে, যা জামিন অযোগ্য অপরাধ। কিন্তু ডিম এমন এক অনন্য অস্ত্র, যা নেতার শরীরে কোনো স্থায়ী ক্ষতি করে না, অথচ মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে তাঁর দীর্ঘদিনের গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাবমূর্তি এবং দম্ভকে এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। ডিমের দাগ ড্রাই ক্লিনিংয়ে উঠে যায় ঠিকই, কিন্তু জনস্মৃতিতে সেই অপমানের দাগ আজীবন থেকে যায়।

বিশ্ব রাজনীতিতে ডিম-বিস্ফোরণের কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত:

  • থিয়েটার থেকে রাজপথ: এই ঐতিহ্যের শিকড় পোঁতা রয়েছে ব্রিটেনের এলিজাবেথীয় যুগে। থিয়েটারে কোনো অভিনেতা খারাপ অভিনয় করলে দর্শকরা রেগে গিয়ে তাঁদের লক্ষ্য করে পচা ডিম ছুড়তেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রথা রাজনেতাদের দম্ভ চূর্ণ করার জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম হয়ে ওঠে।
  • অস্ট্রেলিয়ার ‘এগ বয়’ কাণ্ড (২০১৯): ইতিহাসের সবচেয়ে ভাইরাল ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে। উগ্র-ডানপন্থী অজি সেনেটর ফ্রেজার অ্যানিং ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে জঙ্গি হামলার জন্য পরোক্ষে মুসলিমদের দায়ী করলে, ১৭ বছর বয়সী কিশোর উইল কনোলি সেনেটরের সভায় গিয়ে তাঁর টেকো মাথায় কাঁচা ডিম ফাটিয়ে দেয়। এরপর সেনেটর তাকে ঘুষি মারলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়।
  • জন প্রেসকটের ‘টু জ্যাবস’ (২০০১): ব্রিটেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট একবার নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ডিমের আঘাতে রক্তাক্ত হননি, কিন্তু রেগে গিয়ে তিনি পাল্টা ওই চাষিকে সজোরে ঘুষি মেরে বসেন। এরপর থেকে সংবাদমাধ্যমে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘টু জ্যাবস’। মজার বিষয়, আজ যেখানে এই কাণ্ড ঘটেছিল, সেখানে একটি স্মারক ফলক বসানো রয়েছে।
  • রিচার্ড নিক্সন ও ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ: আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তিনটি ভিন্ন দেশে তিনবার ডিমের হামলায় শিকার হন। আবার ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, প্যারিসে বিক্ষোভকারীরা তাঁর ওপর ডিম ও সবজি ছুড়ে মেরেছিল।

বাংলায় কি নতুন অধ্যায়?

ব্রিটেনের হ্যারল্ড উইলসন থেকে জেরেমি করবিন—ডিমের ঘা খেয়েছেন বহু হেভিওয়েট নেতা। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলার রাজনীতির নাম। সোনারপুরের রাস্তায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির সামনে ডিমের বৃষ্টি—এটি কি কেবলই একটি ঘটনা? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে জনমানসের গভীর কোনো বার্তা? রাজনীতির কারবারিরা মনে করেন, যখন কথা বলার জায়গা ফুরিয়ে আসে, তখনই গণতন্ত্রে এই ধরনের ‘ডিম্বাস্ত্র’ পথে নেমে আসে। এটি দম্ভ ভাঙার সঙ্কেত নাকি জনরোষের বহিঃপ্রকাশ, তা নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *