তৃণমূলের অন্দরে নজিরবিহীন ভাঙন, লোকসভায় ঘর বাঁচাতে মমতার সামনে বড় ভরসা কংগ্রেসের হাত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে, তা এখন জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয়। রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এই চরম সঙ্কটের মাঝেই জল্পনা ছড়িয়েছে যে, দীর্ঘ ২৮ বছর পর আবার পুরোনো দল কংগ্রেসে মিশে যেতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। কংগ্রেস সূত্রে খবর, তৃণমূল সুপ্রিমোকে ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদের প্রস্তাব দিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী। ছাত্রাবস্থায় কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতি শুরু করা এবং ১৯৯৮ সালে দল ছেড়ে তৃণমূল গঠন করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সম্ভাব্য ‘ঘরওয়াপসি’র নেপথ্যে রয়েছে দলত্যাগ বিরোধী আইনের এক জটিল রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্ক।
তৃণমূলের দ্বিমুখী ভাঙন ও আইনি সঙ্কট
নির্বাচনে হারের পর তৃণমূল কংগ্রেস মূলত দুটি বড় ব্লকে খণ্ড খণ্ড হয়ে গিয়েছে। বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬৪ জন বিধায়ক আলাদা দল গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। যেহেতু এই সংখ্যাটি মোট বিধায়কের দুই-তৃতীয়াংশ ছুঁয়ে ফেলেছে, তাই দলত্যাগ বিরোধী আইন মেনে তাঁদের পদ খারিজ করা আসাম্ভব। উল্টে তাঁরা আদালতে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে দলের প্রতীক ও সম্পত্তির অধিকার পেয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে, লোকসভাতেও সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জনই আলাদা ব্লক তৈরি করে এনডিএ শিবিরকে সমর্থনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি রাজ্যসভায় সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেবের মতো হেভিওয়েটদের ইস্তফার পর কোয়েল মল্লিকের পদত্যাগও এখন সময়ের অপেক্ষা। এই দ্বিমুখী ভাঙনে লোকসভা ও রাজ্যসভায় তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে।
দলত্যাগ বিরোধী আইন ও মমতার সম্ভাব্য মাস্টারস্ট্রোক
এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে লোকসভা ও রাজ্যসভায় নিজের ক্ষমতা ও ঘর বাঁচাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূতকরণের (মার্জার) কৌশল নিচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতীয় সংবিধানের দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত সদস্য যদি একসঙ্গে দল ছাড়েন বা অন্য কোনো দলের সঙ্গে মিশে যান, তবে তাঁদের পদ খারিজ হয় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতা যদি তাঁর অনুগামী সাংসদদের নিয়ে সরাসরি জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যান, তবে সংসদের উভয় কক্ষে তাঁদের সদস্য সংখ্যা একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। এর ফলে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের জোটটি আর দুই-তৃতীয়াংশের আইনি সুরক্ষাকবচ পাবে না। তখন তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নিয়ে সাংসদ পদ খারিজ করা সম্ভব হবে। যদিও বিধানসভার ক্ষেত্রে এই কৌশল খাটবে না, কারণ সেখানে বিদ্রোহীদের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে সংসদের দুই কক্ষে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে মমতার সামনে এই মুহূর্তে কংগ্রেসের হাত ধরা ছাড়া অন্য কোনো সহজ বিকল্প নেই।