“ক্যারিয়ার নষ্ট হবে না”— অভয় দিয়েছিলেন অধ্যাপকরা, তাও কেন হস্টেলে চরম পথ বাছলেন আইআইটির মেধাবী ছাত্র?

দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি বম্বে (IIT Bombay) ক্যাম্পাসে ফের মর্মান্তিক শোকের ছায়া। পরীক্ষার হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘চ্যাটজিপিটি’ (ChatGPT) ব্যবহার করে প্রশ্নপত্রের উত্তর খোঁজার অভিযোগে ধরা পড়ার পর, হস্টেলের ঘর থেকে উদ্ধার হলো বিটেক দ্বিতীয় বর্ষের এক মেধাবী ছাত্রের ঝুলন্ত দেহ। শুক্রবার সন্ধ্যার এই বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে তুমুল বিক্ষোভ ও উত্তেজনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো পাওয়াই ক্যাম্পাস।
মৃত ছাত্রের নাম সাহিল রবীন্দ্র ওয়াকোড়ে (২২)। তিনি মহারাষ্ট্রের ইয়াভাৎমাল জেলার বাসিন্দা এবং আইআইটি বম্বের এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঠিক কী ঘটেছিল পরীক্ষার হলে? সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, শুক্রবার আইআইটি বম্বেতে মিড-সেমিস্টার পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সাহিল নিজের স্মার্টফোন ব্যবহার করে প্রশ্নপত্রের ছবি তোলেন এবং চ্যাটজিপিটি অ্যাপে আপলোড করে সরাসরি উত্তর বের করার চেষ্টা করেন। বিষয়টি দায়িত্বে থাকা ইনভিজিলেটরের নজরে আসতেই তিনি সাহিলকে হাতেনাতে ধরেন এবং বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপকদের বিষয়টি জানান।
তবে আইআইটি কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, এই অপরাধের জন্য সাহিলের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরীক্ষা শেষে বিভাগীয় প্রধান এবং ইনস্ট্রাক্টর সাহিলকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে কাউন্সিলিং করেন। এই ভুলের কারণে তাঁর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন বা একাডেমিক ক্যারিয়ারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না বলেও তাঁকেই আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
হস্টেলের ঘরে নিথর দেহ উদ্ধার, স্তব্ধ ক্যাম্পাস অধ্যাপকদের ঘর থেকে বের হয়ে সাহিল স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ৪ নম্বর হস্টেলের ঘরে ফিরে আসেন। তবে সন্ধ্যার দিকে ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সহপাঠীদের সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে দরজা খুলে ঘরের ভিতর ঝুলন্ত অবস্থায় সাহিলের দেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পাওয়াই থানার পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে রাজাওয়াদি হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
সাহিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গভীর রাতে ক্যাম্পাস স্তব্ধ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হন শত শত শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সঠিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার দাবিতে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ চলমান মিড-সেমিস্টার পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
মানসিক চাপ নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন পরিস্থিতি সামাল দিতে মুম্বই পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (DCP) দত্তাত্রয় নালাওয়াড়ের নেতৃত্বে একটি বড় পুলিশ দল আইআইটি ক্যাম্পাসে পৌঁছায়। ডিরেক্টর ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা হলেও ক্যাম্পাসে থমথমে আমেজ বজায় রয়েছে।
আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ এক বার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, একজন উদীয়মান শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁরা মৃত ছাত্রের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি তদন্তে পুলিশকে সব ধরনের সাহায্য করছে।
উল্লেখ্য, গত মাত্র সাত মাসের মধ্যে আইআইটি বম্বেতে এটি তৃতীয় কোনো শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা। দেশের সেরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একের পর এক এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা শিক্ষার্থীদের ওপর তৈরি হওয়া মানসিক চাপ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।