আশা ভোঁসলের জীবনাবসান: সুরের রাজত্বে উজ্জ্বল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে সয়েছেন একের পর এক শোক

আশা ভোঁসলের জীবনাবসান: সুরের রাজত্বে উজ্জ্বল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে সয়েছেন একের পর এক শোক

ভারতীয় সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। শনিবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে রবিবার তিনি জীবনের লড়াই থামিয়ে দেন। দীর্ঘ আট দশকের ক্যারিয়ারে হাজারো কালজয়ী গান উপহার দিলেও, এই সুরসম্রাজ্ঞীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম ট্র্যাজেডি ও হারানো বেদনায় নীল।

সাফল্যের শিখরে ব্যক্তিগত জীবনের বিষাদ

আশা ভোঁসলের পেশাদার জীবন যতটা বর্ণিল ছিল, তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল ততটাই কন্টকাকীর্ণ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। সেই সংসারে তার তিন সন্তান ছিল। পরবর্তীতে ঘর ভাঙার পর তিনি খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে সংগীতের এই সাফল্যের আড়ালে সন্তানদের হারানো শোক তাকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে।

সন্তানদের অকাল মৃত্যু ও জীবনের বড় ধাক্কা

আশা ভোঁসলের জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি করেছিল তার দুই সন্তানের মৃত্যু। যা কোনো মা হিসেবে মেনে নেওয়া ছিল আসাম্ভব।

  • কন্যা বর্ষার আত্মহত্যা: ২০১২ সালের ৮ অক্টোবর আশা ভোঁসলের একমাত্র কন্যা বর্ষা ৫৬ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। বর্ষা একজন পেশাদার কলামিস্ট ছিলেন। মেয়ের এই চরম সিদ্ধান্ত কিংবদন্তি এই শিল্পীকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
  • বড় ছেলে হেমন্তের মৃত্যু: বড় ছেলে হেমন্ত ভোঁসলে পেশায় প্রথমে পাইলট এবং পরে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। একের পর এক প্রিয়জনকে হারানোর শোক ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

আগামীর পথে উত্তরসূরি ও উত্তরাধিকার

সন্তানদের হারানোর শোক বুকে নিয়েও আশা ভোঁসলে শেষ দিন পর্যন্ত তার ছোট ছেলে আনন্দ ভোঁসলের ওপর ভরসা রেখেছেন। বর্তমানে তার সংগীত ও পারিবারিক ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকজন উত্তরসূরি রয়েছেন।

  • আনন্দ ভোঁসলে: ছোট ছেলে আনন্দ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও চলচ্চিত্র পরিচালনা জগতের সাথে যুক্ত। মায়ের শেষ দিনগুলোতে তিনিই ছায়ার মতো পাশে ছিলেন।
  • চৈতন্য ভোঁসলে: হেমন্ত ভোঁসলের ছেলে অর্থাৎ আশার নাতি চৈতন্য সংগীতের ধারা বজায় রেখেছেন। তিনি ভারতের প্রথম বয় ব্যান্ড ‘এ ব্যান্ড অফ বয়েজ’-এর সদস্য।
  • জানাই ভোঁসলে: আনন্দের মেয়ে জানাই মুম্বাইয়ের একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত দক্ষ কত্থক নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পী।

সংগীতের অজেয় রাজত্ব ও বিশ্ব রেকর্ড

আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বৈচিত্র্যের প্রতীক। ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান গেয়ে তিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছেন। ভজন, গজল থেকে শুরু করে কাওয়ালি—সবক্ষেত্রেই তার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। তার প্রয়াণে একটি যুগের অবসান হলেও, তার কণ্ঠস্বর অমর হয়ে থাকবে।

একঝলকে

  • নাম: আশা ভোঁসলে (৯২ বছর)।
  • পরিবার: দুই ছেলে (হেমন্ত ও আনন্দ) এবং এক মেয়ে (বর্ষা)।
  • শোকের স্মৃতি: ২০১২ সালে মেয়ে বর্ষার আত্মহত্যা এবং ২০১৫ সালে বড় ছেলে হেমন্তের ক্যান্সারজনিত মৃত্যু।
  • উত্তরাধিকার: নাতি চৈতন্য ভোঁসলে (সংগীতশিল্পী) এবং নাতনি জানাই ভোঁসলে (নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পী)।
  • রেকর্ড: ২০টির বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান গেয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *