রাত জাগা কি ডেকে আনছে অকাল ডায়াবেটিস এবং হরমোনের মরণফাঁদ!

রাত জাগা কি ডেকে আনছে অকাল ডায়াবেটিস এবং হরমোনের মরণফাঁদ!

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আইটি, চিকিৎসা ও পরিবহন খাতের মতো জরুরি সেবাগুলোতে নাইট শিফট বা নৈশকালীন ডিউটি এখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, রাতের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত হওয়া কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয়, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ বিপাক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে আনছে। প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে রাতে জেগে থাকায় শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে।

শরীরের জৈব ঘড়ি ও হরমোন বিপর্যয়

মানুষের শরীর মূলত দিনের আলোয় কাজ করা এবং রাতে বিশ্রামের জন্য বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় নাইট শিফট করার ফলে শরীরে ‘মেলাটোনিন’ নামক অত্যন্ত জরুরি একটি হরমোনের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এই হরমোন কেবল ঘুমের জন্যই নয়, বরং শরীরের অন্যান্য হরমোন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকদের মতে, নৈশকালীন কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সমস্যায় ভুগছেন। এর ফলে ওজন স্বাভাবিক থাকলেও শরীরের অভ্যন্তরে মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা নিঃশব্দে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি

সাম্প্রতিক এক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, নাইট শিফট কর্মীদের শরীরে ভিটামিন-ডি এর তীব্র অভাব এবং থাইরয়েডের সমস্যা প্রকট হচ্ছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন লেভেল কমে যাওয়া এবং নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শারীরিক জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভালো কোলেস্টেরলের (HDL) ঘাটতি হৃদরোগের আশঙ্কা তৈরি করছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, বাইরে থেকে কাউকে সুঠাম বা রোগা দেখালেও তার শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারের পথ

এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা জীবনযাত্রায় বিশেষ পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন। নৈশকালীন ডিউটি শেষে দিনের বেলা অন্তত ৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া রাতে ভারী খাবারের বদলে হালকা সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ এবং দিনের বেলা পর্যাপ্ত সূর্যালোক বা ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিয়মিত বিরতিতে ব্লাড সুগার, থাইরয়েড এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করার মাধ্যমে এই ‘সাইলেন্ট কিলার’ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

এক ঝলকে

  • নৈশকালীন ডিউটির ফলে শরীরে মেলাটোনিন হরমোন কমে যায় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়।
  • নাইট শিফট কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশের ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের উচ্চ ঝুঁকি দেখা গেছে।
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে থাইরয়েড সমস্যা, ভিটামিন-ডি এর অভাব ও কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পায়।
  • ঝুঁকি এড়াতে দিনে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা আবশ্যক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *