হরমুজ প্রণালী খুলতে আমেরিকার সামনে শর্ত ইরানের! ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারির মাঝেই তুঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা

হরমুজ প্রণালী খুলতে আমেরিকার সামনে শর্ত ইরানের! ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারির মাঝেই তুঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আবহে এবার আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংলাপের ইঙ্গিত মিলছে। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য আমেরিকার কাছে একটি শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ইরান দ্রুত কোনও চুক্তিতে না পৌঁছলে তাদের তেল পাইপলাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কী শর্ত রাখল ইরান?

ইরানের নয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আমেরিকা যদি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে আর্থিক অবরোধ তুলে নেয়, তবে তেহরানও তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হবে, যেখানে মূল লক্ষ্য থাকবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা।

ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি এবং ইরানের পাল্টা জবাব

  • ট্রাম্পের ডেডলাইন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য তাদের হাতে মাত্র তিন দিন সময় আছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তেল রফতানি ব্যাহত থাকলে পাইপলাইনের ভেতরের চাপ মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। এর ফলে কারিগরি কারণে সেগুলো ফেটে যেতে পারে, যা পুনরায় চালু করা প্রায় আসাম্ভব হয়ে পড়বে।
  • ইরানের পাল্টা হুঙ্কার: ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের কাছেও একাধিক বিকল্প রয়েছে। বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। গ্রীষ্মকালে তেলের চাহিদা বাড়লে খোদ আমেরিকাতেও তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে, যা সেখানকার রাজনীতি ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে।

ইরানের জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা

হরমুজ প্রণালী খোলার লক্ষ্যে দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘুঁটি সাজাচ্ছে ইরান।

  • রাশিয়ার সমর্থন: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোমবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পুতিন পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে আমেরিকার মোকাবিলা করার জন্য ইরানের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।
  • প্রস্তাব পর্যালোচনা: আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি প্রস্তাব পেয়েছে এবং তা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
  • আঞ্চলিক কূটনীতি: গত তিন দিনের মধ্যে আরাঘচি দু’বার পাকিস্তান সফর করেছেন। পাশাপাশি ওমান, কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ভারতের উদ্বেগ

পশ্চিম এশিয়ায় এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সেন্টকম-এর তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৩৮টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে।

  • এমটি সিরন-এ হামলা: গত ২৫ এপ্রিল ওমানের শিনাস বহিঃবন্দরের কাছে টোগোর পতাকাবাহী রাসায়নিক ট্যাংকার ‘এমটি সিরন’-এর ওপর সতর্কতামূলক গুলি চালায় ইরানের উপকূলরক্ষী বাহিনী। এই ট্যাংকারে ১১ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। ভারতের বন্দর, নৌপরিবহণ ও জলপথ মন্ত্রক জানিয়েছে, পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
  • আগের হামলা: এর আগে গত ২২ এপ্রিল আইআরজিসি (IRGC) ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ এবং গুজরাটের মুন্দ্রাগামী ‘এপামিনোন্ডাস’ নামের দুটি জাহাজে হামলা চালায়। ১৮ এপ্রিলও ওই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী দুটি অনুমোদিত ভারতীয় জাহাজে হামলার ঘটনায় ভারত তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

প্রতিবেদক: স্বাধীন মানব দাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *