বঙ্গের হাইভোল্টেজ লড়াই: ঝালমুড়ি বনাম সবজির ঝুড়ি! ৪ মে কি ফিরবে তৃণমূল নাকি ইতিহাস গড়বে বিজেপি?

বঙ্গের হাইভোল্টেজ লড়াই: ঝালমুড়ি বনাম সবজির ঝুড়ি! ৪ মে কি ফিরবে তৃণমূল নাকি ইতিহাস গড়বে বিজেপি?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্যায়ের মহাযুদ্ধের আগে সোমবার থেমেছে প্রচারের গর্জন। আগামী ২৯ এপ্রিল শেষ দফার ভোটগ্রহণ এবং ৪ মে নির্ধারিত হবে বাংলার মসনদ কার দখলে যাবে। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক লড়াই শুধু নীতি বা আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পৌঁছে গিয়েছে ঝালমুড়ি থেকে সবজির বাজারের অলিগলিতে। একদিকে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের নেতৃত্বে বিজেপি তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলও এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ।

ঝালমুড়ি বনাম সবজির ঝুড়ি: জনসংযোগের নয়া রসায়ন

এবারের প্রচারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দুই শিবিরের ভিন্নধর্মী জনসংযোগ পদ্ধতি।

  • মোদী ও ঝালমুড়ি: ঝাড়গ্রামে রাস্তার ধারের দোকানে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খেয়ে এবং নিজের হাতে দাম মিটিয়ে প্রধানমন্ত্রী বার্তা দিতে চেয়েছেন তিনি সাধারণ মানুষেরই একজন। এটি বিজেপির ‘সাধারণের সাথে সংযোগ’ কৌশলের অন্যতম বড় উদাহরণ।
  • মমতা ও সবজির ঝুড়ি: অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছে স্থানীয় বাজারে সবজি কিনতে এবং দোকানদারদের সাথে আড্ডা দিতে। সবজির ঝুড়ি হাতে নিয়ে তিনি মূলত মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেছেন এবং নিজেকে ‘বাংলার মেয়ে’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

হেভিওয়েটদের প্রচারের পরিসংখ্যান

বাংলার মন জিততে দিল্লি এবং নবান্ন—উভয় পক্ষই প্রচারের রেকর্ড গড়েছে।

  • বিজেপি শিবির: প্রধানমন্ত্রী মোদী ২১টি জনসভা ও ৩টি রোড শোর মাধ্যমে ঝড় তুলেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০টি জনসভা ও ১১টি রোড শো করে সংগঠনের ভিত শক্ত করেছেন।
  • তৃণমূল শিবির: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ৩০টিরও বেশি জনসভা ও রোড শো করেছেন। তবে প্রচারের গতিতে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ৫০টিরও বেশি জনসভা ও পদযাত্রার মাধ্যমে তৃণমূলের নির্বাচনী ইঞ্জিনকে সুপারফাস্ট গতি দিয়েছেন।

ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

বাংলার রাজনীতিতে এবার ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। থাণথানিয়া কালীবাড়ি, দক্ষিণেশ্বর এবং বেলুড় মঠে প্রধানমন্ত্রীর সফর এবং অমিত শাহের গঙ্গাসাগর স্নান ও ইসকন মন্দির দর্শন—বিজেপির হিন্দুত্ব ও আধ্যাত্মিকতার প্রচারকে স্পষ্ট করেছে। পাল্টা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চণ্ডীপাঠ ও মন্দির পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বাংলার সনাতন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাঁর হাতের তালুর মতোই চেনা।

লড়াই যখন ‘দিল্লি বনাম বাংলা’

তৃণমূলের মূল অস্ত্র ছিল ‘আঞ্চলিক পরিচিতি’। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বহিরাগত হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে বাংলা শাসন হবে এই মাটি থেকেই। অন্যদিকে, বিজেপি ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী ও দিলীপ ঘোষের মতো স্থানীয় নেতারা বুথ স্তর পর্যন্ত প্রচার চালিয়েছেন।

ফলাফল কি চমক দেবে?

২৯ এপ্রিল ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণের পর ইভিএম বন্দি হবে প্রার্থীদের ভাগ্য। ৪ মে স্পষ্ট হয়ে যাবে বাংলার মানুষ মোদীর ‘পরিবর্তন’-এর স্লোগানে সাড়া দিলেন নাকি মমতার ‘ঘরের মেয়ে’ তত্ত্বে আস্থা রাখলেন। লড়াই এখন সমানে সমান—একদিকে ঝালমুড়ির স্বাদ, অন্যদিকে সবজির ঝুড়ির ঝাঁজ।

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন স্বাধীন মানব দাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *